
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে রিস্ক বেইজড সুপারভিশন (আরবিএস) ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির (বিবিটিএ) এ. কে. এন, আহমেদ অডিটোরিয়ামে এক বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ, মনসুর প্রধান অতিথি হিসেবে এবং ডেপুটি গভর্নরবৃন্দ, গভর্নর মহোদয়ের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির নির্বাহী পরিচালক বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের আরবিএস সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকবৃন্দ, সকল সুপারভাইজরি বিভাগের কর্মকর্তাগণ এবং শাখা অফিসসমূহের সুপারভিশন সংশ্লিষ্ট পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির নির্বাহী পরিচালক জনাব মোঃ হানিফ মিয়া। তিনি বলেন, আরবিএস বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের পাশে রয়েছে। আরবিএস কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাত আরও শক্তিশালী ও টেকসই হবে এবং ভবিষ্যতেও বিবিটিএ এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুক্ত থাকবে মর্মে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গভর্নর মহোদয়ের উপদেষ্টা জনাব মো. আহসান উল্লাহ তাঁর বক্তব্যে সুপারভিশন কার্যক্রমে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং আর্থিক সংকটকালে কার্যকর সুপারভিশনের গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ তাঁর বক্তব্যে ২০২৫ সালে সংঘটিত বিভিন্ন আর্থিক খাত-সম্পর্কিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে গৃহীত সংস্কারমূলক উদ্যোগসমূহ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকসমূহের জন্য রেজল্যুশন কাঠামো প্রণয়ন, ইসলামী ব্যাংকসমূহ একীভূতকরণ সংক্রান্ত স্কীম প্রণয়ন, খেলাপি ঋণ হ্রাস, ও FRS-9 বাস্তবায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হার স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। একক ও ঝুঁকিনির্ভর সুপারভিশনের মাধ্যমে ফ্র্যাগমেন্টেড সুপারভিশন ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
ডেপুটি গভর্নর জনাব মো. জাকির হোসেন চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে সুপারভিশন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সুপারভিশন নিশ্চিত করতে দক্ষ, সাহসী ও স্বচ্ছ সুপারভাইজরের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, পাইলট পর্যায় শেষে এখন আরবিএস বাস্তবায়নের সময় এসেছে, যেখানে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও আইএফসি-এর কারিগরি সহায়তায় এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক হতে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তুতকৃত আরবিএস ফ্রেমওয়ার্ক ঝুঁকি শনাক্ত, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হবে মর্মে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিনটি প্রধান দায়িত্ব-মুদ্রানীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও সুপারভিশনের মধ্যে সুপারভিশনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তিনি সুপারভাইজরদের স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে নৈতিকতা ও আচরণবিধি মেনে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক খাতে রিজার্ভ বৃদ্ধি ও বিনিময় হার স্থিতিশীলতা আর্থিক খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে এবং এ প্রেক্ষাপটে আরবিএস বাস্তবায়ন সময়োপযোগী।
ডেপুটি গভর্নর জনাব নূরুন নাহার মন্তব্য করেন, পরিবর্তনশীল ও জটিল ব্যাংকিং পরিবেশে ডিজিটাল, সাইবার, ফিনটেক ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় রিস্ক বেইজড সুপারভিশন একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি। তিনি বলেন, আরবিএস ঝুঁকিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং ভবিষ্যতদর্শী সুপারভিশনের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও ঝুঁকি মোকাবেলার সংস্কৃতি জোরদার করবে। তিনি এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ, মনসুর বলেন, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আরবিএস কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, সুপারভিশন আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। RBS-এর মাধ্যমে একক সুপারভিশন ইউনিট থেকে ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাংকেগুলোর ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা যাবে এবং রিয়েল-টাইম ডাটার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা পাওয়া সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, সুপারভিশন টিম ও ব্যাংক একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই আরবিএস-এর মূল লক্ষ্য হবে। গভর্নর মহোদয় ফরেনসিক আরবিএস চালু, IFRS-9 বাস্তবায়ন, ব্যাংক রেজল্যুশন ব্যবস্থা জোরদার এবং আধুনিক, স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর কেন্দ্রীয় ব্যাংক গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আরবিএস বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রতিফলন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন নির্বাহী পরিচালক জনাব মো. সিরাজুল ইসলাম।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply