ইমন মাহমুদ লিটন, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: বর্ষাকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের পঞ্চবটী, আমলাপাড়া সহ পাশর্বর্তী কয়েকটি এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন লোক মারা যাবার পর লাশের সৎকারের জন্য শ্মশান ঘাটে নিতে হলে একমাত্র ভরসা নৌকা কিংবা কলা গাছের ভেলা। সামর্থবানরা ভাড়ায় নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলেও অসচ্ছল পরিবারের বেলায় তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনা। তাই গরিবরা নিরুপায় হয়ে স্বজনের লাশ কলাগাছের ভেলায় করে শ্মশানে নিয়ে যায়। এমনটাই জানা যায় পঞ্চবটী এলাকার হিন্দু মুসলমান কয়েকজনের সাথে কথা বলে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দাবির প্রেক্ষিতে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ারকে সাথে নিয়ে জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন। তিনি বলেন, রাস্তাটি হয়ে গেলে মরদেহের সৎকার করতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আর দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।
সরেজমিনে জানা যায়, পৌর শহরের ৩ নং ওয়ার্ড পঞ্চবটীর মূল রাস্তার দক্ষিণ দিকের শেষ মাথা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃতদেহ সৎকারের জন্য একমাত্র শ্মশানঘাট। সত্তুর থেকে আশি বছর পেরিয়ে গেলেও হয়নি কোনো সংস্কার। নেই লাশ নিয়ে যাবার মতো রাস্তা। বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্ধ আশার আরো দেখালেও তা আজও পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। জায়গাটি অনেক নিচু হওয়ায় বর্ষার শুরু থেকে পানিতে তলিয়ে থাকে বছরের কয়েক মাস। এ সময়টাতে হিন্দু ধর্মের মৃত ব্যক্তির লাশ সৎকারের জন্য শ্মশানঘাটে নিতে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শুকনো মৌসুমে কাঁধে করে নেয়া গেলেও বর্ষার মৌসুমে তা আর সম্ভব হয় না। কোথাওবা কোমর পর্যন্ত পানি আবার কোথাও বা বুক সমান পানি থাকে। এ জায়গাটুকু পাড় হতে নৌকা ভাড়া করার জন্য লাশ নিয়ে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। সচরাচর কোনো নৌকা লাশ বহন করতে রাজি হয় না। অনেক চেষ্টার পর যদিও কোনো মাঝি রাজি হয় তাও দিতে হয় অনেক টাকা। সামর্থ্যবানদের বেলায় সম্ভব হলেও অসচ্ছল ব্যক্তিদের বেলায় তা সম্ভব হয় না। দরিদ্ররা কলা গাছের ভেলা বানিয়ে তাতে লাশ বহন করে শ্মশানে নিয়ে যায়। উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় হিন্দু ধর্মের লোকজনের মৃতদেহ সৎকারে শ্মশানঘাটের এ রাস্তাটি করে দিয়ে দুর্ভোগ কমিয়ে আনবে, এমনই প্রত্যাশা হিন্দু সম্প্রদায়ের।
এলাকাবাসী বলেন, পঞ্চবটীর শেষ মাথা থেকে শ্মশান খলা হয়ে মেঘনা নদীর তীর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। বর্ষাকালে হিন্দু ধর্মের মৃত লোককে শ্মশানে আনতে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। গরিবরা কেউ মারা গেলে তারা কলা গাছের ভেলায় করে পানিতে ভাসিয়ে লাশ নিয়ে আসে শ্মশানে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কথা ভেবে এ রাস্তাটি হওয়া অতীব জরুরি।
ভৈরব উপজেলা হিন্দু খ্রিষ্টান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুব্রত কুমার রায় সুমন বলেন, এই শ্মশানটি হচ্ছে আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য শেষ ঠিকানা। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত এ রাস্তাটি করে দেয়নি কোনো সরকার। বর্ষাকালে এ জায়গাটি সম্পূর্ণভাবে ডুবে যায়। লোকালয় থেকে শ্মশান অনেকটা দূরে হওয়ায় মৃতদেহের শেষকৃত্য সারতে শ্মশানে আনার সময় অনেক কষ্ট হয়। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, এ রাস্তাটি করে দিয়ে আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মৃতদেহ সৎকারে দুর্ভোগ কমিয়ে আনবে।
সাবেক পৌর কাউন্সিলার আখতারুজ্জামান আক্তার বলেন, আমাকে অনেক পীড়া দেয় যখন দেখি হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে বর্ষাকালে লাশ নিয়ে অপেক্ষা করছে একটি নৌকার জন্য। সামর্থ্যবানরা ভাড়া নৌকা পেলেও গরিবদের বেলায় তা আর হয় না। তারা কলা গাছের ভেলায় মৃতদের সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে আসে। এমন দৃশ্য হৃদয় বিদারক। আমি তৎকালীন পৌর কাউন্সিলার থাকাকালীন সময়ে একাধিকবার চেষ্টা করার পরও নানান প্রতিকূলতার কারণে সম্ভব হয়নি।
আদিলুজ্জামান দুলাল বলেন, আমরা বরাবরই চেষ্টা করেছি এ রাস্তাটি করার জন্য। শ্মশান সংলগ্ন জব্বার জুট মিল কর্তৃপক্ষের সাথে অনেক দেন দরবার ও রফাদফা করে রাস্তার জন্য কিছুটা জায়গাও নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করতে পারিনি। তৎকালীন সময়ে যারা দায়িত্বে ছিলেন মূলত তাদের অসহযোগিতার কারণেই রাস্তাটি আর করা সম্ভব হয়নি।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একমাত্র শ্মশানঘাটে মরদেহ নিয়ে যাবার জন্য রাস্তাটির অবস্থা খুবই নাজুক। তাদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল এ রাস্তাটি যেন করে দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে জানার পর আমরা উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জায়গাটি পরিদর্শন করেছি। এ রাস্তাটি নিয়ে জনসাধারণের যে ভোগান্তি ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যে দাবিটি রয়েছে অতি শীঘ্রই সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply