
জাহারুল ইসলাম জীবন, বিশেষ প্রতিনিধি: আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে সারাদেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হবে পবিত্র লাইলাতুল বরাতের রজনী- ‘শবে বরাত’। হিজরি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত এই রাতটি মুসলিম উম্মাহর কাছে ‘লাইলাতুল বরাত’ বা ‘মুক্তির রজনী’ হিসেবে পরিচিত। এই রজনীকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বইছে আধ্যাত্মিকতার আমেজ, যেখানে ব্যক্তিগত তওবা ও সামষ্টিক প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত কামনাই মূল লক্ষ্য।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে পবিত্র শবে বরাতের তাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:- ইসলামি তাত্ত্বিকতায়, ‘বারাত’ শব্দের অর্থ মুক্তি বা বিচ্ছেদ। এ রাতে গুনাহগার বান্দারা আল্লাহর দরবারে কাঁন্নাকাঁটি করে পাপ থেকে মুক্তি পায় বলেই একে লাইলাতুল বরাত বলা হয়।
* বিবেচ্য হাদিস মতে শবে বরাত:- উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করতেন এবং বলতেন, এ রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।
* আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে পবিত্র শবে বরাত:- সুফি ও আলেমদের মতে, এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার রাত নয়, বরং এটি একটি ‘আধ্যাত্মিক অডিট’ বা আত্মসমালোচনার রাত। গত এক বছরের ভুলভ্রান্তি শুধরে নিয়ে আগামী বছরের জন্য মহান আল্লাহর কাছে কল্যাণ ভিক্ষা করার মোক্ষম সুযোগ এটি।
** রাষ্ট্রীয় বার্তা ও প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান:- পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ বাণী দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এই রাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের বাণীতে আরো বলেন- “আত্মসমালোচনা ও তওবার মাধ্যমে জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারি আল্লাহ তায়ালার অসীম অনুগ্রহ।”
তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনার পাশাপাশি মানব কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করার জন্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, এ উপলক্ষে আগামী বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরকারি ছুটি থাকবে।
** বায়তুল মোকাররমের বিশেষ আয়োজন:- ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মাগরিবের পর থেকেই শুরু হবে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা:
* সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিট:- মুফতি মাওলানা নজরুল ইসলাম কাসেমী পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে শবে বরাতের ফজিলত ও তাৎপর্য তুলে ধরবেন।
* রাত ৮:৩০ মিনিট:- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ‘শবে বরাতের শিক্ষা, করণীয় ও বর্জনীয়’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা পেশ করবেন।
* সমাপনী অনুষ্ঠান:- সারা রাত ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য মসজিদ উন্মুক্ত থাকবে এবং ফজরের পর আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান।
** পবিত্র শবে বরাতের বারতায় সমসাময়িক প্রেক্ষাপট্ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা:- বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে্ শবে বরাতের গুরুত্ব কেবল মসজিদে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনৈতিক সংকট ও বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে এই রাতটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইবাদতের পাশাপাশি গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাবার বিতরণ ও দান-সদকার মাধ্যমে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে আলেম সমাজ সতর্ক করেছেন যে, শবে বরাতের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো কাজ- যেমন: পটকা ফোঁটানো বা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা-ইসলামি সংস্কৃতির অংশ নয়। বরং নীরব ইবাদত ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমেই এই রাতের প্রকৃত হাকিকত অর্জন সম্ভব।
** গণমাধ্যমের বিশেষ প্রস্তুতি:- শবে বরাতের ফজিলত ও তাৎপর্য নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ আলোচনা সভা ও হামদ-না’ত প্রচার করবে। সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হবে পবিত্র শবে বরাতের বিশেষ নিবন্ধ।
সর্বপরি ইসলামের পরিভাষায় সারকথায় বলতে-ই হয়, পবিত্র এই শবে বরাত আমাদের শেখায় কীভাবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসতে হয়। তওবা ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে এক শান্তি-কল্যাণ ও সমৃদ্ধময় বাংলাদেশ সহ সমগ্র বিশ্ব গড়ার শপথ নেওয়ার রজনী আজ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইবাদত যথাযথ ভাবে কবুল করুন- আমিন।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply