মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫২ অপরাহ্ন

সংবাদেও নড়েনি পরিবেশ অধিদপ্তর: সাভারের হারুলিয়া গ্রামে অবৈধ টায়ার কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২৪ Time View

সাভার উপজেলার ভাকুরতা ইউনিয়নের হারুলিয়া গ্রামে লাইসেন্সবিহীনভাবে পরিচালিত অবৈধ টায়ার কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী ও কৃষকরা। টায়ার পুড়িয়ে ফার্নেস অয়েল উৎপাদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ চালিয়ে গেলেও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হারুলিয়া গ্রামে আলম ও আমজাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তত দুটি অবৈধ টায়ার কারখানা দিনের পর দিন টায়ার পুড়িয়ে কালো ও বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। এই ধোঁয়ায় বাতাস ভারী ও শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা, বমিভাব, ত্বকের রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন বহু মানুষ। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

কৃষকরা জানান, টায়ার পোড়ানোর ফলে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও কালো ছাই জমির ওপর পড়ে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ধান ও সবজির পাতা পুড়ে যাচ্ছে, ফলন কমে যাচ্ছে, জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। অনেক গরু-ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং হাঁস-মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে করে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, কারখানার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে কথা বলতে তারা ভয় পান।

অনেকেই মনে করেন, নাম প্রকাশ করলে হয়রানি, হুমকি বা বিভিন্ন চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই অধিকাংশ অভিযোগই করা হচ্ছে পরিচয় গোপন রেখে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একাধিকবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন মাঝে মাঝে এলাকায় এসে শুধু ঘুরে দেখেই চলে যান, কিন্তু কারখানা বন্ধ বা জরিমানা কিংবা আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সংবাদ প্রকাশের পরও যদি দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো নীরব থাকে, তবে অবৈধ কারখানাগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

সাংবাদিকরা অভিযুক্ত কারখানার মালিক আলম ও আমজাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। একাধিকবার চেষ্টা করেও তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“এই বিষয়টি আগে আমাদের জানা ছিল না। এখন যেহেতু আপনাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার এলাকায় কোনো অবৈধ ও পরিবেশবিধ্বংসী কারখানা চলতে দেওয়া হবে না। বিষয়টি আমি গুরুত্বসহকারে দেখব।”

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, টায়ার পুড়িয়ে ফার্নেস অয়েল উৎপাদন একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম। যথাযথ পরিবেশগত ছাড়পত্র, আধুনিক প্রযুক্তি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের কারখানা পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে বায়ু, মাটি ও পানি দূষণের পাশাপাশি পুরো এলাকার বাস্তুতন্ত্র ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।
হারুলিয়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও কৃষকদের জোর দাবি, অবিলম্বে সব অবৈধ টায়ার কারখানা বন্ধ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা তদন্ত করে তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণও খতিয়ে দেখতে হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পরও কেন পরিবেশ অধিদপ্তর নীরব, আর প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়। হারুলিয়া গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় আছে—এই অবৈধ টায়ার কারখানার বিরুদ্ধে আদৌ কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো খবর »

Advertisement

Ads

Address

© 2026 - Economic News24. All Rights Reserved.

Design & Developed By: ECONOMIC NEWS