মোঃ আব্দুল্লাহ হক, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ডিস্টিলারি দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড একদিকে ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের রেকর্ড গড়েছে, অন্যদিকে সম্পদ মূল্যায়ন ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় উঠে এসেছে চরম অসংগতির চিত্র। সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৬২ হাজার ৬০৪ টাকা, অর্থাৎ প্রতি বিঘার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ টাকা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেরুজ কমপ্লেক্সের মালিকানাধীন ৩ হাজার ৫৫৬ একর (১০ হাজার ৬৬৮ বিঘা) জমির এ মূল্য বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, যেখানে এলাকায় প্রতি বিঘা জমির বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা, সেখানে মাত্র ৫৩ টাকা দেখানো অবিশ্বাস্য।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা হয়েছে ১২৯ কোটি টাকা, যা কেরুজের ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও চিনি খাতে লোকসান হয়েছে, মদ বিক্রির আয় দিয়ে তা সমন্বয় করে এই মুনাফা দেখানো হয়েছে।
সম্প্রতি হাবিব সারোয়ার ভুঁইয়া অ্যান্ড কো. নামের একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব অসংগতি উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে জমির পুনর্মূল্যায়ন না করা আন্তর্জাতিক হিসাবমানের পরিপন্থী।
নিরীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়, কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৫ কোটি ৯৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯৬ টাকা। তবে অডিটের শেষ পর্যায়ে তথ্য সরবরাহ করায় এসব সম্পদের সরেজমিন যাচাই সম্ভব হয়নি। সম্পদের অবস্থান, শনাক্তকরণ নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও অনুপস্থিত ছিল।
এছাড়া আখসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনকারী গাছকে জৈবিক সম্পদ হিসেবে মূল্যায়ন করে হিসাবভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে প্রকৃত সম্পদের তুলনায় মোট সম্পদের পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মজুত পণ্য ও স্টোর সামগ্রী নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা। ৭২ কোটি ৭৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৭ টাকার মজুত পণ্য এবং ৩৪ কোটি ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৬০৪ টাকার স্টোর সামগ্রীর বিপরীতে কোনো পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি রিপোর্ট দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনাধীন পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও নিয়ম না মেনে সমাপ্ত পণ্যের ৮০ শতাংশ ধরে হিসাব করা হয়েছে, যার কোনো বোর্ড অনুমোদন নেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈদেশিক ঋণ রূপান্তরে বছরের শেষ দিনের বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়নি এবং বিলম্বিত করের হিসাবও রাখা হয়নি। আগের বছরের বার্ষিক রিটার্ন যথাসময়ে আরজেএসসিতে জমা না দেওয়ায় শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
শ্রমিক কল্যাণ তহবিলেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬২ টাকার অবণ্টিত অর্থের ওপর শ্রমিকদের প্রাপ্য সুদ দেওয়া হয়নি, যা শ্রম আইনের লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ত্রৈমাসিক ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি জরিমানার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
এ বিষয়ে কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, “এটি অনেক আগের পুনর্মূল্যায়নের হিসাব। বর্তমান বাজারদরে পুনর্মূল্যায়নের জন্য নতুন করে অডিট ফার্ম নিয়োগের বিষয়ে বোর্ডে আলোচনা হয়েছে। অনুমোদনের পর টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।”
কেরুজের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুহম্মদ আব্দুছ ছাত্তার বলেন, “সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়নি—এটা সঠিক নয়। তবে জমি ও গাছের ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার আহ্বায়ক তানভীর রহমান অনিক বলেন, “যেখানে এক বিঘা জমির দাম কয়েক লাখ টাকা, সেখানে ৫৩ টাকা দেখানো সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রহসনের শামিল।”
অন্যদিকে কর অঞ্চল কুষ্টিয়ার পরিদর্শক জাকির হাসান বলেন, “নিয়মিত ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়া ও হিসাবের অসংগতি থাকলে তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।”
রেকর্ড মুনাফার এই সাফল্যের আড়ালে সম্পদ ও হিসাব ব্যবস্থাপনার এমন অসংগতি কেরুজ কমপ্লেক্সের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।