প্রতিষ্ঠার ৪০ পেরিয়ে ৪১-এ পা দিয়েছে দেশের সর্বপ্রথম বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক এবি ব্যাংক। আরব বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচিতি নিয়ে ১৯৮২ সালের ১২ই এপ্রিল ব্যাংকটি তার কর্মকান্ড শুরু করে। বিগত ৪০ বছরে অনেক মাইলফলক অর্জন এবং অসংখ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবি সর্বদাই বাংলাদেশের একটি প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্ভাবনী ব্যাংক হিসেবে নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছে।
প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা নিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারিক আফজাল সোমবার (১১ এপ্রিল) কথা বলেছেন গণমাধ্যম এর সাথে।
এবি ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আফজাল বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতিক্রমে ২০১৯ এবং ২০২০ সালে স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছিলাম। ইনশাল্লাহ ২০২১ সালেও আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। ২০২১ সালে মন্দ ঋণের মাত্রা আমরা ৩৩ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১৪ শতাংশতে নিয়ে এসেছি। ২০১৯, ২০ এবং ২১ সালে ধারাবাহিকভাবে এবি ব্যাংক প্রত্যেকটি প্যারামিটারে উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে।
কারণ আমরা সার্থকভাবে আমাদের যে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করতে পেরেছিলাম। ২০১৮ সালে আমাদের যে বৃহৎ মন্দ ঋণ ছিল বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ এবং বিচারের মাধ্যমে সে মন্দ ঋণ আদায়ে আমরা অনেক সুফল পেয়েছি। গত দুই বছরে আমরা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার মতো আদায় করতে পেরেছি।
আমি বারবার একটি কথা বলেছি যে, যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয় সেই ঋণ সময় মত ফেরত দিতে হবে। এতে ব্যাংকারের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার পাশাপাশি কোন ধরনের চাপ বা কোন ধরনের অনুরোধের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকখাতের চিহ্নিত খেলাপিদের সবাই চিনি। সুতরাং আমাদের মন্দ ঋণ ঠেকাতে চিহ্নিত খেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার। তাদেরকে নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, যে ঋণ তারা নিয়েছেন সেগুলোকে নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। যদি তা না করা যায় এবং এটি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে তাহলে ঝুঁকির মাত্রা বাড়তেই থাকবে।
তারিক আফজাল বলেন, আমাদের উচিত কৃষি শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দিকে অগ্রসর হওয়া। এদিকে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি তাহলে মন্দ ঋণ বা বেনামী ঋণের প্রশ্ন আর আসবে না। আমরা যদি মন্দ ঋণ থেকে উত্তোলন করা দুই হাজার কোটি টাকা সারা
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে ভাগ করে দেই তাহলে আমাদের ঝুঁকির মাত্রা কম থাকবে। এতে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি একজন ব্যক্তিকে এই ঋণ দেই তবে সেটি যদি খেলাপি হয়ে যায় তাহলে দুই হাজার কোটি টাকাই ঝুঁকিতে পড়বে। তাই আমাদের এদিকে খেয়াল রাখা উচিৎ।
এবি ব্যাংকের এমডি বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখনো সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা দরকার। যদিও সরকার আন্তরিক তবে তাদের হাতকে সুসংহত করার জন্য আমাদের ব্যবসায় সংগঠনগুলোকে আরো সচেতন হওয়া জরুরী।
তাদের নিয়ম-নীতি আরও কঠোর হওয়া জরুরী। তারা শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের দিকে ঝুঁকবে তা হতে পারে না। তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে সুসংহত করতে তাদেরকে দায়িত্বশীল হতে হবে। এজন্য বিজিএমইএ এবং এফবিসিসিআই’র উচিত তাদের যারা খেলাপি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া। এতে ব্যাংকের উপর ঝুঁকির মাত্রা কিছুটা কমে আসবে।
তারেক আফজাল বলেন, আমরা সবাই চিহ্নিত খেলাপিদের চিনি। কিন্তু আমরা আবার তাদেরকেই ঋণ দিচ্ছি। আমরা এর বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গ্রাহক তৈরি করে তাদের ঋণ দিতে চাইনা। কারণ এসব লোনে কষ্ট বেশি। তবে এবি ব্যাংক এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ দিচ্ছে। কারণ আমরা জানি, আমরা যদি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে আমরা ঝুঁকি মুক্ত থাকবো এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকি মুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ এবং শ্রীলংকার অর্থনীতি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০৪০ সালের একটি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে যাত্রা করতে যাচ্ছে। এদেশের সরকারের কাছে রিজার্ভ রয়েছে। যে কারণে করোনা মহামারীর সময় এক লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা দিতে পেরেছে। এতে আমাদের অর্থনীতি সচল ছিল।
এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মহামারির সময় বাংলাদেশের যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ছিলো যেমন, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এলিভেটর এক্সপ্রেস এগুলোর কাজও সচল ছিলো। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট শ্রীলংকার সাথে কোনভাবে মিলানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন লোন দেরিতে পরিশোধ করেনি। আমরা যেসব সেক্টরে অন্য দেশের ব্যাংকগুলো থেকে লোন নিচ্ছি তার অর্থ পরিশোধে কখনা আমাদের একদিনও দেরি হয়নি। আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু আমরা লোন পরিশোধের কখনো আর দেরি করি না। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক মজবুত, এটার সাথে শ্রীলঙ্কাকে তুলনা করা কোন সুযোগ নেই।