মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল: একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে এসে মানবসভ্যতা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং জটিল প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমাদের হাতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বায়োটেকনোলজি এবং বিগ ডেটার মতো মহাবিস্ফোরণ; অন্যদিকে ঠিক সমান্তরালভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে মানুষের স্বাধীন, মৌলিক ও মুক্তচিন্তার পরিধি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইন্টারনেটের চশমায় তথ্যের অবাধ প্রবাহে পৃথিবী এখন সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং সংযুক্ত। কিন্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এক অদৃশ্য দেয়াল আমাদের সামষ্টিক চিন্তাশক্তিকে বন্দি করে ফেলছে- যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটছে এক গভীর, সর্বগ্রাসী বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বে। এই সংকটটি কেবল রাজনৈতিক মেরুকরণ বা সামাজিক অস্থিরতার অংশ নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন, নিউরো-বায়োলজিক্যাল রূপান্তর এবং আধুনিক পুঁজিবাদের প্রযুক্তিগত কার্যকারণ। যখন কোনো সমাজে প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে যায় এবং চিন্তার ওপর স্থবিরতা ভর করে, তখন সভ্যতার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞান বলে- মানুষের মস্তিষ্ক কোনো স্থির বা জড় বস্তু নয়, এটি সদা পরিবর্তনশীল এবং অভিযোজনক্ষম- যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (Neuroplasticity)। আমরা যখন কোনো নতুন, জটিল বা আমাদের বিশ্বাসের বিপরীতধর্মী চিন্তার মুখোমুখি হই, তখন মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন সিন্যাপটিক সংযোগ বা পথ তৈরি হয়। একেই বলে মুক্তচিন্তার এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জৈবিক ভিত্তি। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের কগনিটিভ ক্ষমতা বা বোধশক্তি বিকশিত হয়। কিন্তু সমসাময়িক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবসায়িক অ্যালগরিদম এই নিউরোপ্লাস্টিসিটিকে উল্টো পথে চালিত করছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং সার্চ ইঞ্জিনগুলো আমাদের মনের অজান্তেই তৈরি করছে ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber) এবং ‘ফিল্টার বাবল’ (Filter Bubble)। সিলিকন ভ্যালির তৈরি এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ঠিক সেই তথ্য, সংবাদ বা মতামতগুলোই বারবার আমাদের স্ক্রিনে নিয়ে আসে- যা আমাদের পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ক্ষোভ বা মতাদর্শের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে এক ধরনের ক্ষতিকর ‘কনফরমেশন বায়াস’ (Confirmation Bias) বা নিজের মতকে অন্ধভাবে সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা চূড়ান্ত রূপ নেয়। যখন একজন মানুষ বছরের পর বছর ধরে কেবল তার নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়, তখন তার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Confirmation Bias)- যা যুক্তিবাদী চিন্তা, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী, তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও নমনীয়তা হারাতে শুরু করে। মানুষ তখন ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এটিই মুক্তচিন্তার প্রথম এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক দেয়াল- যা আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের ব্রেইনের ভেতর অলক্ষ্যে তৈরি করে দিচ্ছে।
আমরা এখন বাস করছি ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ বা তথ্যের অতিপ্রবাহের এক উন্মাদ যুগে। মানব ইতিহাসের আর কোনো সময়ে মানুষ এত তথ্যের সংস্পর্শে আসেনি। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, তথ্যের এই মাত্রাতিরিক্ত সুনামি মানুষের মনোযোগের পরিধি বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ (Attention Span) নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে মানুষের গভীর মনোযোগ ধরে রাখার গড় সময়কাল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তথ্যের এই মহাসমুদ্র মানুষকে ‘তথ্যসমৃদ্ধ’ (Informed) করছে ঠিকই, কিন্তু তাকে ‘প্রজ্ঞাবান’ (Wise) বা ‘জ্ঞানী’ করে তুলছে না। গভীর অধ্যয়ন, দীর্ঘমেয়াদী মননশীলতা এবং কোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আধুনিক মানুষের ভেতর লোপ পাচ্ছে। কোনো বিষয়ের মূল জেনেসিস বা উৎস না জেনে, কেবল ওপর ওপর ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে সোশ্যালে তর্ক করার এবং রায় দিয়ে দেওয়ার এই সর্বজনীন প্রবণতাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। আমরা এখন সত্য অনুসন্ধান করছি না বরং হেডলাইন এবং রিলস বা শর্টস-এর ১৫ সেকেন্ডের ভিজ্যুয়াল বিনোদনে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষুধা মেটানোর সস্তা চেষ্টা করছি। এর ফলে সমাজে এমন এক শ্রেণির ইনফ্লুয়েন্সার তৈরি হচ্ছে- যাদের চিন্তায় কোনো মৌলিকত্ব নেই, আছে কেবল জনপ্রিয় সস্তা আবেগের অন্ধ অনুকরণ। প্রজ্ঞার স্থান দখল করে নিয়েছে সস্তা তথ্যের আসক্তি।
মুক্তচিন্তার দ্বিতীয় বড় দেয়ালটি মনস্তাত্ত্বিক নয় বরং এটি সমাজতাত্ত্বিক। একে আমরা বলতে পারি আধুনিক ‘ক্যান্সেল কালচার’ (Cancel Culture) বা ভিন্নমত বর্জনের সংস্কৃতি। সমাজবিজ্ঞানের বুনিয়াদি তত্ত্ব অনুযায়ী- একটি সুস্থ, গতিশীল ও প্রগতিশীল সমাজের মেরুদ- হলো ভিন্নমতের সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু বর্তমান সময়ে ভিন্নমতকে যুক্তির দ্বারা খ-ন করার ধৈর্য বা মেধা সমাজ হারিয়ে ফেলছে। এর বদলে ভিন্নমতাবলম্বীকে সামাজিকভাবে বয়কট, ডিজিটাল মবলিং (অনলাইন আক্রমণ), চরিত্রহনন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগ করে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছে। যখন কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে প্রশ্ন করার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা কোনো প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করাকে বিপজ্জনক করে তোলা হয়, তখন সেখানে বিজ্ঞান, দর্শন এবং সাহিত্যের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষী- গ্যালিলিও, সক্রেটিস বা জর্দানো ব্রুনোদের যুগেও শাসকেরা মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে কঠোর দেয়াল তুলেছিল। আজকের ডিজিটাল যুগেও ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মোড়কে সেই একই দেয়াল তোলা হচ্ছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম কোনো নতুন বা প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ভয় পাচ্ছে। এই ভয় এবং এর থেকে জন্ম নেওয়া ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ (Self-censorship) সমাজকে এক স্থবির, অনুকরণপ্রিয় এবং মেরুদ-হীন প্রজন্মের দিকে ঠেলে দিচ্ছে- যা দীর্ঘমেয়াদে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
আমাদের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাও এই বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব ও স্থবিরতা তৈরির জন্য সমভাবে দায়ী। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান (Pedagogy) বলে, শিক্ষার মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটানো। অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে শেখানো হবে কোনো কিছুকে অন্ধভাবে না মেনে ‘কেন’, ‘কীভাবে’, ‘কার স্বার্থে’ এবং ‘কোথায়’- এই মৌলিক প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে মাত্রাতিরিক্ত জিপিএ কেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর এবং নিখাদ বাজারমুখী। আমরা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ককে একেকটি ডেটা স্টোরেজ বা কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক বানিয়ে ফেলছি, যেখানে বছরের শুরুতে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য ইনপুট দেওয়া হয় এবং পরীক্ষার খাতায় তা হুবহু আউটপুট হিসেবে উগরে দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সৃজনশীলতা, মৌলিক দর্শন বা মানবিক মূল্যবোধের কোনো স্থান নেই। এই যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করপোরেট বিশ্বের জন্য হয়তো খুব দক্ষ ‘কেরানি’, ‘ক্যাডার’ বা ‘শ্রমিক’ তৈরি করতে পারছে; কিন্তু সমাজ পরিচালনার জন্য, ঐতিহাসিক সংকট উত্তরণের জন্য কিংবা মানবতাকে পথ দেখানোর জন্য কোনো দূরদর্শী ‘বুদ্ধিজীবী’, ‘চিন্তাবিদ’ বা ‘দার্শনিক’ তৈরি করতে পারছে না। জ্ঞান যেখানে কেবল জীবিকা অর্জনের হাতিয়ার, সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব অবধারিত।
এই গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কী? বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পথ দেখায়- (ক) কগনিটিভ ডাইভারসিটি (Cognitive Diversity) বা চিন্তার বৈচিত্র্যকে আলিঙ্গন করা: আমাদের সচেতনভাবে এমন সব বই, প্রবন্ধ, ইতিহাস বা মনস্তাত্ত্বিক মতামত পড়তে হবে, যা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যকারিতা ও সিন্যাপটিক সংযোগ বাড়ায়, মনকে নমনীয় করে এবং অন্ধ গোঁড়ামি দূর করে। (খ) ডিজিটাল ডিটক্স এবং গভীর পঠন (Deep Reading): স্ক্রিন ও সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশনের দাসত্ব কমিয়ে বই পড়ার মূল ধারায় ফিরে আসতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জটিল বা তাত্ত্বিক বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখার চর্চা-যাকে ক্যাল নিউপোর্ট ‘ডিপ ওয়ার্ক’ (Deep Work) বলেছেন-তা আমাদের চিন্তার হারিয়ে যাওয়া গভীরতা ও ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে। (গ) প্রশ্ন করার স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক স্বীকৃতি: পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রশ্ন করার সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং উৎসাহিত করতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে- ভুল প্রশ্ন বা অবান্তর প্রশ্নও সমাজের জন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়, কিন্তু প্রশ্ন না করার সংস্কৃতি বা প্রশ্ন করতে ভয় পাওয়া একটি জীবন্ত সভ্যতার জন্য সবচেয়ে আত্মঘাতী। মুক্তচিন্তা কোনো তাত্ত্বিক বিলাসিতা বা কেতাবি শব্দ নয়; এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার, বিকশিত হওয়ার এবং বিবর্তিত হওয়ার সবচেয়ে মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত। চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনবাদ যেমন বলে- পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে যে প্রজাতি খাপ খাওয়াতে পারে না, সে প্রকৃতির নিয়মেই বিলুপ্ত হয়ে যায়; ঠিক তেমনি সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের দর্শন বলে- যে সমাজ বা জাতি সময়ের সাথে সাথে চিন্তার বিবর্তন ঘটাতে পারে না, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না, সেই জাতি সভ্যতার প্রতিযোগিতায় জরায়ুতেই মারা যায় বা অন্যের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসে পরিণত হয়।
মুক্তচিন্তার যে অদৃশ্য দেয়ালগুলো আজকে প্রযুক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের হাত ধরে আমাদের চারপাশে অবলীলায় গড়ে উঠছে, তা যদি আমরা আমাদের যৌথ প্রজ্ঞা, নৈতিক সাহস এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আঘাত করে ভাঙতে না পারি, তবে একবিংশ শতাব্দীর এই চোখধাঁধানো প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কেবলই এক কংক্রিটের প্রাণহীন কঙ্কাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর তার ভেতরে বাস করবে এক দিশাহীন, প্রজ্ঞাহীন, যুক্তিহীন এবং চরম দেউলিয়া মানবসমাজ। এখনই সময় সেই দেয়ালগুলো ভেঙে চিন্তার আকাশকে উন্মুক্ত করার, মানুষের মগজকে অ্যালগরিদমের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার।