ঢাকা, ১ নভেম্বর ২০২৬:
রাজধানীর মিরপুর ১৫ নম্বরে অবস্থিত ‘বিজয় রাকিন সিটি’ আবাসন প্রকল্প এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’ (মুমুপকস) আজ এক গভীর সংকট ও ভয়ংকর অপশাসনের মুখে পড়েছে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৭ সালে নিবন্ধিত এই সমিতি ও আবাসন প্রকল্প কোনো সরকারি অনুদান কিংবা সরকারি কোষাগারের বাজেটে নির্মিত হয়নি। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকানা ও নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত সমিতির নিবন্ধিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের পরিবার এবং বৈধ ফ্ল্যাট মালিক-বাসিন্দাদের রক্ত-ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থে গড়ে তোলা এক স্বপ্নের ঠিকানা।
কিন্তু সম্প্রতি এই ব্যক্তিমালিকানাধীন কল্যাণ সংস্থায় প্রশাসক নিয়োগের আইনি সুযোগ ও অনুচ্ছেদকে চাতুর্যের সাথে ব্যবহার করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরোক্ষভাবে সমিতি দখলের অসৎ উদ্দেশ্যে প্রশাসক হিসেবে আসীন হয়েছেন এক বিতর্কিত ব্যক্তি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই নবনিযুক্ত প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ইতিপূর্বে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অর্থ কেলেঙ্কারির সাথে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অপসারিত হয়েছিলেন। সেই অপসারিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি এই কল্যাণ সমিতির প্রশাসকের পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে অবৈধ দখলবাজি, সীমাহীন দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক ভয়াল অধ্যায়।
প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেই ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সমিতির মূল কার্যালয়টি বহিরাগত সশস্ত্র পেটুয়া ও সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বেআইনিভাবে দখল করে নেন। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অপকৌশল ও দুর্নীতির থলথলে সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল নিবন্ধিত ও বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের উচ্ছেদ করে বহিরাগতদের অবৈধভাবে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার হীন লক্ষ্যে প্রশাসক এক ভয়ংকর চক্রান্ত বাস্তবায়নে নেমেছেন। তিনি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে সমিতির আসল ও রেজিস্টার্ড সদস্য-বাসিন্দাদের অন্যায্যভাবে বাদ দিয়ে একের পর এক বহিরাগতদের অনৈতিকভাবে নতুন সদস্য বানানোর অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বহিরাগতদের ফ্ল্যাটের লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এমনকি সমিতির নিজস্ব সঞ্চিত তহবিল থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বহিরাগতদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া এই কালো টাকা ,অবৈধ লেনদেন ও সকল অনৈতিক কর্মকান্ড ধামাচাপা দিতে এবং ভুয়া নতুন সদস্যদের অন্যায্যভাবে ফ্ল্যাটে বসিয়ে আসল মালিকদের উচ্ছেদ করতেই সমিতির কার্যালয় জবরদখল করে রাখা হয়েছে এবং বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দিয়ে পুরো প্রকল্পে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে।
যেসব ফ্ল্যাট মালিক বৈধ দলিল, নিবন্ধিত বণ্টননামা ও নামজারির মাধ্যমে পূর্ণ মালিকানা অর্জন করে নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করে বসবাস করছেন, তাদের এখন প্রতিনিয়ত নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখানো হচ্ছে। কোনো আদালতের নির্দেশনা না থাকা সত্ত্বেও বহিরাগত সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ফ্ল্যাট মালিক ও প্রবীণ বাসিন্দাদের ওপর নামিয়ে আনা হয়েছে ভয়ংকর অত্যাচার। যেসব নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিক ও সমিতি সদস্য এই অবৈধ অফিস দখল, ভুয়া সদস্য বানিয়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অপচক্রান্ত, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, তাদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক আক্রমণ। প্রতিবাদী সদস্যদের দমাতে তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। অনবরত হুমকি, ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার জালে আটকে বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের জীবনকে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও এক বিষাক্ত নিপীড়নের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে, যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ আর মুখ খোলার সাহস না পায়।
প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের যাবতীয় অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি, কার্যালয় দখল, ভুয়া সদস্য বানিয়ে অবৈধ উচ্ছেদের হুমকির প্রতিবাদে এবং বাস্তব সত্য দেশবাসী ও সরকারের উচ্চ মহলের সামনে তুলে ধরতে গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিক ও সমিতি সদস্যরা জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের অপকর্ম, অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক তাণ্ডবের মুখোশ চিরতরে খুলে যাওয়ার ভয়ংকর আতঙ্কে ভীত হয়ে দুর্নীতিবাজ প্রশাসক তার পোষ্য বহিরাগত সন্ত্রাসী বাহিনীকে পাঠিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বর্বরোচিত হামলা চালায়। সেখানে উপস্থিত প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমিতির সদস্যদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে আবাসন প্রকল্পের ভেতরেও রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (বিডি) লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) রাশিদুল এবং জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবুল কালামের প্রত্যক্ষ ইশারা ও প্ররোচনায় অপু রহমান, আব্দুল মমিন, শামিম, পিজুস, রেজাউল ও সজলসহ প্রায় ১০০/১৫0 বহিরাগত সন্ত্রাসী কোনো ধরনের আইনি এখতিয়ার ছাড়াই জোরপূর্বক প্রবেশ করে সিকিউরিটি গার্ডদের মারধর করে এবং সাবল দিয়ে ভবনের মেইন গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তারা ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালায় এবং ভুক্তভোগী কামরুল হাসানসহ অনেককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
এই সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট মালিক কামরুল হাসান বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে কাফরুল থানায় এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।
অনুসন্ধানে পাওয়া এসব বিস্ময়কর ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সত্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশাসকের সাথে সরাসরি ও টেলিফোনে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানের স্বার্থে সমিতি কার্যালয়ে উপস্থিত হলে প্রশাসকের জায়গায় দেখা মেলে জামুকা থেকেও অপসারিত বিতর্কিত বহিরাগত আমির আলীর, যিনি নিজেকে প্রশাসকের ‘ম্যানেজার’ বলে দাবি করেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ও কার্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে প্রশ্ন করা মাত্রই তিনি জরুরি কাজের অজুহাত দেখিয়ে তড়িঘড়ি সটকে পড়েন এবং কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
পরবর্তীতে এই আমির আলী সম্পর্কে একাধিক বৈধ ফ্ল্যাট মালিক ও সমিতির স্থায়ী সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, জামুকা থেকে অপসারিত এই আমির আলী মূলত অত্যন্ত দুর্বৃত্ত প্রকৃতির ও দুর্নীতিপরায়ণ একজন মানুষ। তিনি সম্পূর্ণ বহিরাগত; সমিতির অতীতে বা বর্তমানে কোনো কালেই তিনি এর কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা নিবন্ধিত সদস্য ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সমিতির কার্যালয়ে জেঁকে বসে প্রশাসকের সাথে হাত মিলিয়ে সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন এবং নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র মূল নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিকদের আবাসন নিরাপত্তা রক্ষা এবং কোটি কোটি টাকার সঞ্চিত তহবিল উদ্ধারে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়ে নিম্নোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হচ্ছে:
১. পূর্বে জামুকা থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অর্থ কেলেঙ্কারির দায়ে অপসারিত বিতর্কিত প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে অবিলম্বে বরখাস্ত ও অপসারণ করতে হবে।
২. বহিরাগত সন্ত্রাসীদের তাড়িয়ে দিয়ে অবৈধভাবে দখলকৃত সমিতির কার্যালয় দ্রুত উদ্ধার করে প্রকৃত ও নিবন্ধিত সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
৩. বৈধ মালিকদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের অনৈতিকভাবে সদস্য বানানোর ভুয়া চক্রান্ত এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া ও তহবিল তছরুপের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সত্যের পক্ষে সোচ্চার প্রতিবাদী ফ্ল্যাট মালিকদের বিরুদ্ধে করা সকল মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং আবাসন প্রজেক্ট প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়ে প্রবীণ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতকারী সমস্ত চিহ্নিত বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।