বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দিয়ে খুব শীঘ্রই ঘোষণা করা হতে পারে নতুন কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ইউনিটের কমিটি। প্রথমে কেন্দ্রীয় ও মহানগর ইউনিটের ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি গঠনের কথা শুনা যাচ্ছে। সেই শর্ট কমিটিতে জায়গা পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন বর্তমান ও সাবেক কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা। এর সাথে ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতাও এই দৌড়ঝাঁপে শামিল রয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে,তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ডেকে বিএনপির হাইকমান্ড কথাও বলেছেন। তবে এবার কমিটি হবে সঠিক যাচাই বাছাই আর সুনিপুণ বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে। এলক্ষ্যে দায়িত্ব প্রাপ্তরা খুব গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করছেন বলে অনেকের ধারণা। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের ভূমিকার সাথে সাংগঠনিক দক্ষতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। । বিগত দিনে রাজনীতি কুক্ষিগত করা দু/একটি বলয় নিজেদের বলয় টিকিয়ে রাখার সুবিধার্থে বিভিন্ন অঞ্চলের সমন্বয়ের আওয়াজ তুললেও কমিটি হবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অভিজ্ঞ ও তরুণ নেতাদের সমন্বয়ে। এক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা কোন বাঁধা বা বাড়তি সুবিধা দিবে না।
বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ প্রত্যাশী নেতাদের বিগত দিনের আমলনামা দেখে বিএনপির হাইকমান্ড এবার এ, বি, সি ক্যাটগরিতে ভাগ করে তিনটি তালিকা করেছেন। সেই তালিকায় বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতারা রয়েছেন ‘এ’ ক্যাটাগরি তালিকায়। তাদের সুপার ফাইভে পদপ্রাপ্তি প্রায় নিশ্চিত। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে চলমান গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পদ প্রত্যাশী ও তাদের পরিবারের কোনো গুরুতর অনিয়ম পেলে তাকে বাদ দিয়ে ‘বি’ তালিকার নেতা ওই পদে স্থান পাবেন। একইভাবে ‘বি’ তালিকার নেতা যদি কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বাদ পড়েন তাহলে ‘সি’ তালিকার নেতাকে দিয়ে সুপার ফাইভ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত ভিড় করা নেতাকর্মীরা জানান, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী, সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, সাবেক প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদরেজ জামান, সংগঠনটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এ এ জহির উদ্দিন তুহিন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান।
এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি মো. মামুন বিল্লাহ, মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শাদ মোর্শেদ পাপ্পা, স্বেচ্ছাসেবক দলের, বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, বর্তমান কমিটির যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, ছাত্রদলের সাবেক প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নাওয়াজ।
এছাড়াও শর্ট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সমবায় বিষয়ক সম্পাদক মোশারেফ হোসেন মুশু, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন, মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ।
নেতাকর্মীদের বর্ণনামতে, সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী রাজধানীর পল্লবী ইউনিট ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া পল্লবী থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে ইয়াসিন আলী ২১০ মামলা শিকার হন এবং সাড়ে তিন বছর কারাবন্দি ছিলেন।
আলোচনায় থাকা বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি পদে ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে ৮০টি হয়রানিমূলক মামলার শিকার হন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। এছাড়া তিনি ৯ দিন গুম ছিলেন। পরে হাত-পা ভেঙে আদালতে তোলেন তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন। এ ছাড়া ডিবি অফিসে বিভিন্ন মামলায় দিনের পর দিন রিমান্ডে ছিলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাঠ পর্যায়ের জোরালো আলোচনায় থাকা স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এ এ জহির উদ্দিন তুহিন। তিনি এর আগে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির পদে আলোচনায় থাকা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের (রাজীব-আকরাম কমিটি) সাবেক সহ-সভাপতি মো. মামুন বিল্লাহ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র। তিনি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের (জুয়েল-হাবিব কমিটি) সাবেক সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগে একই হল কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন সাবেক এই ছাত্রনেতা।
সাধারণ সম্পাদক পদে স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
সুপার ফাইভের গুরুত্বপূর্ণ পদে আলোচনায় থাকা স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সমবায় বিষয়ক সম্পাদক মোশারেফ হোসেন মুশু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের (সেশন ২০০০-২০০১) ইয়ার কমিটি আহ্বায়ক ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ (রাজীব-আকরাম) কমিটির সহ বৃত্তি ও ছাত্রকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এর আগে, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ (জুয়েল-হাবিব) কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি। মোশারেফ হোসেন মুশু বিগত ওয়াল ইলেভেন থেকে শুরু করে হাসিনা বিরোধী প্রায় সকল আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এতে হয়েছেন অনেক মামলার আসামি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ একাধিক হাই প্রোফাইল নেতার কেস পার্টনার হয়ে অনেক দিন জেল খেটেছেন এবং ফেরারি জীবন-যাপন করেছেন। শুধু নিজে নন তার পুরো পরিবার বিএনপি হওয়ায় সকলেই কমবেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার গ্রামের বাড়িতে জমির ফসল, গবাদি পশু, বাগানের শস্য, পুকুরের মাছ লুট হয়েছে। এমনকি তার বড় বোনের ভিটেমাটি বেদখল হলে ঢাকা শহরে এসে বসবাস করতে বাধ্য হন। ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় মোশারেফ হোসেন মুশুর পল্টন কালভার্ট রোডের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারাতে হয়েছে। দূর্বিসহ জীবন-যাপন করেও বিএনপির আদর্শ থেকে এক চুলও নড়েননি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আওয়ামী নির্যাতনে স্ট্রোক করা বাবাকে হারিয়েছেন ২০২০ সালে। তবুও দমে যাননি, দলের আদর্শ আর রাজনীতি নিয়ে পড়ে রয়েছেন। তিনি ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের বিগত কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক।
নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এমপি বলেন, আমরা আমাদের কাজ করছি। নতুন কমিটি করার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর। ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এসএম জিলানীকে সভাপতি ও রাজিব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় (আংশিক) কমিটি হয়। পরে ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলেও এখনও ৩৭টি পদ শূন্য। এর মধ্যেই মেয়াদ শেষ হয়েছে সংগঠটির বর্তমান কমিটির। তবে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী গোপালগঞ্জ-৩ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান বরিশাল-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।