
আজিজুল গাজী, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: নির্বাচনী ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই দেশজুড়ে জাল টাকার বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে বন্দর এলাকা পর্যন্ত জাল নোটের ছড়াছড়ি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করছে, পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদারের তাগিদ দিচ্ছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি ২০২৬) সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা উদ্ধার হয়েছে। গত ২৩ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার হোমতাবাদ এলাকা থেকে দেশটির কাস্টমস বিভাগ ৬০ হাজার নতুন বাংলাদেশি দুই টাকার নোট উদ্ধার করে। এর আগে গত অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের জাল নোট এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে ১ কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে ডলার ও ইউরোসহ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক জাল মুদ্রাও জব্দ করা হয়।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরেও জাল টাকার বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি যশোরের কেশবপুর এবং শেরপুরের একটি পোস্ট অফিস থেকে গ্রাহকদের হাতে জাল টাকা সরবরাহের ঘটনা ধরা পড়ে। এসব ঘটনায় গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাল টাকার এ বিস্তার শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে বলেন,
“নির্বাচনের আগে কেউ যদি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, সে ক্ষেত্রে জাল নোট ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। ডিজিএফআই, এনএসআই ও সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে এ বিষয়ে বড় ধরনের বৈঠক করা হয়েছে।”
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে পুলিশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রভাবিত করতে বা কেন্দ্রে না আসতে উৎসাহিত করার জন্য অর্থ ছড়ানো হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে কঠোর নজরদারির সুপারিশ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন,
“মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। এটি বর্তমানে আমাদের একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত লেনদেন ব্যবস্থা। তবে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।”
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় সবার দৃষ্টি রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে জাল টাকার মতো অপরাধ নজর এড়িয়ে যায়। তারা মনে করছেন, শুধু সীমান্ত এলাকায় নয়, দেশের অভ্যন্তরেও সমানভাবে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল আমিন বলেন,
“দীর্ঘ সময় পর অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও তারা নিষ্ক্রিয় নেই। তারা বিভিন্নভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। জাল টাকা তারই একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। এজন্য আলাদা ইউনিটের মাধ্যমে আগেভাগেই ডিটেকশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
জাল টাকার ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বড় অঙ্কের লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে করার পরামর্শ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন বাড়ানো গেলে জাল টাকার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। তবে এর পাশাপাশি শক্তিশালী নজরদারি ও সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply