
কার্যাদেশ পাওয়ার পর কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজ ইচ্ছে মতো নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করছেন ঠিকাদার, এমন অভিযোগ উঠেছে খোদ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকেই। সিডিউল মোতাবেক কাজ বুঝে নিতে গেলে ঠিকাদারের লোকজনের হুমকিতে দুজন উপ সহকারী প্রকৌশলী ইতোমধ্যেই বদলী নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ওই রাস্তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে অনিয়মের নানা চিত্র দেখতে পান। উপজেলা প্রকৌশলীও রাস্তাটির বিভিন্ন অনিয়ম দেখে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সহ উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দিলে, তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ-কাটাগাড়ি রাস্তা প্রশস্ত করণ প্রকল্পে এ ধরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় লোকজনও এ রাস্তা নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক(ডিএমডি) মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, তারা সিরাজগঞ্জের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজটি অংশিদারিত্বে ভিত্তিতে করছেন।
অপরদিকে তাদের দেয়া তথ্যানুসারে সিরাজগঞ্জের সে সব ঠিকাদারের সাথে কথা বললে, তারা কেউ বলেন তিনি ওই প্রকল্পের ম্যানেজার আবার কেউ বা বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এসব লুকোচুরির অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে অদৃশ্য কোনো শক্তি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করছেন।
তবে তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় ও প্রকল্পে কর্মরত লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের মালামাল সরবরাহ, অফিসে যোগাযোগ ও কাজের তদারকি করেন সিরাজগঞ্জের ঠিকাদার মির্জা সাইফুল ইসলাম ও মাহবুব ইসলাম। তবে কাজ যে বা যারাই করুন কেনো, এ বিষয়ে সকল প্রকার দায় দায়িত্ব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের, এমনটাই জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রেজাউর রহমান।
একাধিক সমর্থিত সূত্রের দাবি, কাজ না করে অথবা নিম্নমানের কাজ করে বিল তুলে নেয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে দেশের এই প্রভাবশালী এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে। এ কারণে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোপূর্বে কালো তালিকাভূক্ত করা হয়। অবশ্য ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়, তারা প্রকল্পের নিয়ম মেনেই কাজ সম্পন্ন করেন।
তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জনা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের(এলজিইডি) রাজশাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্ত করণ ও শক্তিশালী করণ প্রকল্পের আওতায়, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার হেডকোয়ার্টার হতে কাটাগাড়ি জিসি পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ সহ শক্তিশালী করণের জন্য ট্রেন্ডার আহবান করা হয়।এতে ইজিপি টেন্ডারে ১৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৯৫ টাকার চুক্তিমূল্যে কার্যাদেশ পান চট্রগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। কাজটি পাওয়ার পর তারা সিরাজগঞ্জের ঠিকাদারের সাথে চুক্তিতে প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। প্রকল্পের শর্তানুসারে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত কাজটি সম্পন্ন করার কথা থাকলেও, এলজিইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০ ভাগ। নীতিমালা অনুসারে তারা কাজ না করে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো কাজ করায় একদিকে প্রকল্পের স্থায়ীত্ব নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে। অপরদিকে যত্রতত্র নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখায় এবং এলোমেলো বক্স কার্টিং করে ও কার্পেটিং তুলে তা রোলিং না করায় এ জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দিয়ে চলাচলে চরম দূর্ভোগ দেখা দিয়েছে। ধুলা প্রতিরোধে নিয়মিত পানি ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্প এলাকা ঘুরে এসব কিছুই দেখা যায়নি।
শুরুতেই প্রকল্পের নীতিমালা অনুসরণ না করে নিম্নমানে নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে কাজ করার অভিযোগ ওঠে খোদ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর(এলজিইডির) পক্ষ থেকে। প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড কে দেয়া ১৮ টি কারণ দর্শানো নোটিশের মধ্যে ১৫ টি দিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী মো: ফজলুল হক, ২ টি নোটিশ দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো: আব্দুল বারেক মন্ডল, ১ টি নোটিশ দিয়েছেন রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জি.পি. চৌধুরী ও ১ টি নোটিশ দিয়েছেন সিরাজগঞ্জের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রেজাউর রহমান।
এলজিইডির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এসব নোটিশ কে কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করে তারা নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে কাজ অব্যাহত রেখেছেন। যেখানে প্রকল্পের স্থায়ীত্ব নিয়ে এলজিইডির ভিতর থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে ঠিকাদার কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাব খাটিয়ে ৬৫ লাখ টাকার বিল ইতোমধ্যেই তুলে নিয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন এলজিইডির কর্তৃপক্ষ কে দায়ী করেছেন।
গত ২০২৫ সালের ৩ মার্চ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত এলজিইডির দেয়া ১৮ টি চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নীতিমালা না মেনে, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করছে। এরমধ্যে রয়েছে- রাস্তাটি প্রশস্তকরণের জন্য নীতিমালা না মেনে বক্স কার্টিং করার পর ল্যাব টেস্ট না করে মাটি ও নিম্নমানের বালু দিয়ে ভরাট করা । সেই সাথে নিম্নমানের খোয়া, সোল্ডার ও স্লোপে মাটির কাজ না করেই বক্স কার্টিং সম্পন্ন করা, প্যালাসাডিং এর খুটি ঢালাই না করা, স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত বড় আকৃতির নিম্নমানের খোয়া দিয়ে সাব বেজের কাজ সম্পন্ন করা, প্রকল্প এলাকায় পিকেট/প্রথম শ্রেীণর ইট মজুদ না করে সরাসরি ভাটা থেকে অতি নিম্নমানের খোয় এনে কাজ করা, কোনো প্রকার লেভেলিং এবং ড্রেসিং ছাড়া কাজ করা, ডব্লিউ এম এম করার জন্য সাববেজ অংশে পর্যাপ্ত পিকেট সাইটে না এনে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন খেয়াল খুশিমতো কাজ করা সহ সার্বিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ঠিকমতো রোলিং না করায় সড়কটি স্থায়ীত্ব টেকসই হবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জি.পি. চৌধুরী প্রকল্প পরিদর্শ করে তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, সড়কটিতে বিপুল পরিমান মাটির কাজ ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাজ রয়েছে। পরিদর্শনকালে তিনি দেখতে পান, মাটির কাজ ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাজ না করেই বক্স কার্টিং করে, ল্যাব টেস্ট ছাড়া নিম্নমানের বালি দিয়ে সাববেজের কাজ ঠিকাদার চলমান রেখেছে। একই সঙ্গে রাস্তার উভয় পাশে বক্স কার্টিং নীতিমালা বহির্ভূত হলেও তারা সেই কাজটিই করে চলেছেন। যা কারিগরি দিক থেকে গ্রহণ যোগ্য নয়। অন্যত্র থেকে প্রাকৃতিক মাটি এনে সড়কের দুই পাশে মাটি ফেলে তিন ফিট প্রশস্ত সোল্ডার তৈরির কথা থাকলেও, বাস্তবে দেখা যায়, পাশের খাল থেকে কাদামাটি তুলে সোল্ডারে ব্যবহার করা হচ্ছে।সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাটাগাড়ী আঞ্চলিক সড়কের ভাদাশ ও সেরাজপুর এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক খাল থেকে কাদামাটি তুলে সোল্ডারে ফেলছেন। ভোগলমান চার মাথায় নিম্নমানের ইট ও খোয়া স্টক করে রাখা হয়েছে। কাঁকড়া মেশিন দিয়ে ভালো মানের কার্পেটিংও তুলে ফেলছেন। ধূলা ও এলোমেলো ভাবে সারা সড়কে নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখায় জনদূর্ভোগ চরমে পৌঁচ্ছেছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় ঠিকাদারের হুমকীর মুখে উপ প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম ও সুলভ কুমার বদলী নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী মো: ফজলুল হক বলেন, নীতিমালা মেনে ঠিকারদার কে কাজ করতে বলায়, তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। বিষযটি তিনি তার উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কে জানিয়েছেন।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক(ডিএমডি) মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের কাছে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে কাজ করার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জের ঠিকাদার মির্জা সাইফুল ইসলাম ও মাহবুব ইসলামের সাথে অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে। তারাই মুলত: কাজটি করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঠিকাদার মাহবুব ইসলাম বলেন, তিনি ওই প্রকল্পের ম্যানেজার মাত্র। মির্জা সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত নয়। তবে এলজিইডির পাবনা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোমিন মুজিবুল হক সমাজি প্রকল্প এলাকায় পরিদর্শনে আসলে, কাজের নিম্নমান নিয়ে ঠিকাদার মির্জা সাইফুল ইসলাম কে প্রশ্ন করতে দেখা যায়। মুহুর্তেই সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সড়কটির নিম্নামানের কাজের অভিযোগ তুলে, সংক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অনুলিপি দেওয়া হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে।
অভিযোগকারী ভাদাস গ্রামের বাসিন্দা মো: শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও কোনো প্রকার প্রতিকার পাইনি। ঠিকাদার প্রতিনিয়ত নিম্নমানের কাজ করে গেলেও উপজেলা প্রকৌশলী কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী নীতিমালা মেনে কাজ করার জন্য ১৫ টি নোটিশ দেয়া হয়েছে। আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষও তিনটি নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু তারা কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না।
এলজিইডির সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউর রহমান বলেন, আমি বিষয়গুলো দেখছি, ঠিকাদার কে বলে ভালভাবে কাজটি করানোর চেষ্টা করছি। তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হলে রিটেন্ডার করতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে। তাতে জনদূর্ভোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাড়াশ-কাটাগাড়ী সড়ক মেরামতের কাজের অনিয়মের অভিযোগপত্র এখনো তিনি পাননি। অভিযোগ পেলে জেলা প্রকৌশলী কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply