তারিখ: ৭ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে শ্রমজীবী মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়সংগত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানের অবসান, ন্যায়সংগত মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে আওয়াজ ফাউন্ডেশন, সেই সাথে সংহতি জানায় পোশাক শ্রমিক উন্নয়ন জনকল্যাণ সংস্থা। একই সঙ্গে পরিচর্যা কর্মীদের ন্যায়সংগত মজুরি, গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের নিয়মিত কর্মঘণ্টা, নিয়োগপত্র, ডে-কেয়ার সুবিধা, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সর্বোপরি, সকল শ্রমিকের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে ৭ অক্টোবর, সকাল ১০ ঘটিকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সমাবেশে আওয়াজ ফাউন্ডেশনের কোষাধক্ষ্য খাদিজা আক্তারসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমজীবী মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, অপর্যাপ্ত মজুরি, সামাজিক সুরক্ষার অভাব এবং কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন।
বিশেষ করে ক্যাজুয়াল, অস্থায়ী, ঠিকাদারি, সাব-কন্ট্রাক্টিং ও অন্যান্য পরোক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করা শ্রমিকরা চাকরির নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা ও শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বক্তারা বলেন, একজন শ্রমিক যদি নিয়মিত ও পূর্ণকালীন কাজ করেন, তাহলে শুধু চুক্তির ধরন বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োগের কারণে তাঁকে পূর্ণকালীন কর্মীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
ঠিকাদার, সাব-কন্ট্রাক্টর বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে নিয়োগের অজুহাতে মূল নিয়োগকর্তাকে শ্রমিকের প্রতি তাঁর আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
বক্তারা বলেন, শ্রমিকের মজুরি এমন হতে হবে, যা তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ দেয়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সকল শ্রমিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, চাকরির নিরাপত্তা, নিয়োগপত্র ও কর্মপরিচয়পত্র নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা (Occupational Safety and Health-OSH) শোভন কাজের অন্যতম মৌলিক শর্ত উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করতে হবে। শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উপকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।
নারী শ্রমিকসহ সকল শ্রমিকের জন্য সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও জেন্ডারভিত্তিক হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা আইএলও কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়নের দাবি জানান। কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য কার্যকর, নিরাপদ ও শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
সমাবেশে পরিচর্যা কর্মীদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি, ন্যায়সংগত মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের নিয়মিত ও ন্যায্য কর্মঘণ্টা, ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, কর্মজীবী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য ডে-কেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করাও শোভন কর্মপরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আওয়াজ ফাউন্ডেশন ও পোশাক শ্রমিক উন্নয়ন জনকল্যাণ সংস্থা’র দাবি
বিশ্ব শোভন কর্ম দিবস উপলক্ষে আওয়াজ ফাউন্ডেশন সরকার, মালিক ও নিয়োগকর্তা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি দাবি জানায়-
১. বাঁচার মতো মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা বাস্তবায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
২. অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানের অবসান করতে হবে। নিয়মিত ও পূর্ণকালীন কাজ করা অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, ঠিকাদারি, সাব-কন্ট্রাক্টিং ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত শ্রমিকদের পূর্ণ শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে হবে এবং সকল শ্রমিকের জন্য চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে কার্যকর পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা (OSH) ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য ঝুঁকি প্রতিরোধে নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় Heat Stress Management ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সকল শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, সংগঠিত হওয়া ও যৌথ দর-কষাকষির (Collective Bargaining) অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৭. শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের জন্য নিরাপদ, কার্যকর, নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. নারী শ্রমিকসহ সকল শ্রমিককে যৌন হয়রানি, সহিংসতা ও জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে আইএলও কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. শ্রমিকদের ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, মাতৃত্ব, কর্মহীনতা ও বার্ধক্যের মতো ঝুঁকিতে শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১১. পরিচর্যা কর্মীদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি, ন্যায়সংগত মজুরি, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১২. গিগ ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের ন্যায্য কর্মঘণ্টা, ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. অটোমেশন, AI ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়লে শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
১৪. জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে Just Transition বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৫. শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য, হয়রানি ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।