
গত অক্টোবর/২৫ মাসে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী সুগার মিল সংলগ্ন একটি জমির ধারে ঈশ্বরদী থানা পুলিশ উদ্ধার করে এক বয়স্ক ভ্যানচালকের অর্ধ-গলিত, পোকাযুক্ত ও বিকৃত লাশ। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে লাশটি প্রায় শনাক্ত অযোগ্য ছিল। তবে মৃতদেহের সাথে থাকা শার্ট ও পায়জামা দেখে আত্মীয়-স্বজন লাশটি সনাক্ত করেন।
নিহত ব্যক্তি ইমান আলী (৬০), পেশায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালক। তার ছেলে ইকবাল বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রায় এক মাস তদন্ত চালায় ঈশ্বরদী থানা পুলিশ। পরে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় পাবনার পুলিশ সুপার মহোদয় মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করেন পাবনা জেলা ডিবি পুলিশের কাছে।
পুলিশ সুপার পাবনা মহোদয়ের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজিনুর রহমানের তত্ত্বাবধানে, ওসি ডিবি মোঃ রাশিদুল ইসলাম এর সার্বিক সহযোগিতায় এসআই অসিত কুমার বসাক, এসআই মো. আব্দুল লতিফ এবং এসআই বেনু রায় (পিপিএম) এর নেতৃত্বে একটি চৌকস ডিবি তদন্ত টিম মাঠে নামে।
সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একে একে শনাক্ত করা হয় জড়িতদের। শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান।
অবশেষে কুষ্টিয়া জেলার প্রত্যন্ত এক এলাকায় শনাক্ত করা হয় মূল আসামি শাকিলকে (ছদ্মনাম)। রাত প্রায় ৩টা। ডিবি পুলিশ ঘিরে ফেলে শাকিলের বসতবাড়ি। পুলিশের উপস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
ঘরে পাওয়া যায় শাকিলের স্ত্রী ও মা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা দাবি করে, “শাকিল নামে আমাদের কেউ নেই।” বারবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ডিবি টিমকে ডাইভার্ট করার চেষ্টা চলে।
কিন্তু সব হিসাব বদলে দেয় শাকিলের মাত্র ৭ বছর বয়সী কন্যা। শিশুটি সরল কণ্ঠে বলে দেয়, “শাকিলই আমার আব্বা।”
পুনরায় তল্লাশি চালানো হয় বাড়িতে। অবশেষে মুরগির ঘরের পাশে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয় শাকিলকে।
জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল মুখ খুললে বেরিয়ে আসে এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র।
হত্যার নৃশংস পরিকল্পনা
শাকিল, সাকিব, মামুন ও রাসেল (সবাই ছদ্মনাম) কয়েকদিন ধরে পরিকল্পনা করছিল নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে বয়স্ক ভ্যানচালকদের হত্যা করে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ছিনতাই করবে। পরে ভ্যান বিক্রি করে টাকাগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা নিজেদের কাছে নেয় চাকু, দড়ি, হাতুড়ি ও লাঠি।
ঘটনার রাত আনুমানিক ১২টা। ঈশ্বরদী দাশুড়িয়া মোড়ে অপেক্ষা করছিল শাকিল ও সাকিব। টার্গেট ছিল দুর্বল, বয়স্ক কোনো ভ্যানচালক।
ঠিক সেই সময় বাড়ি থেকে বের হন ইমান আলী। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভ্যান না চালালে সংসারে খাবার জুটবে না। স্ত্রী শিল্পীর মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে বের হলেও তিনি জানতেন না, এটিই স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ দেখা।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে দাশুড়িয়ার দিকে যাচ্ছিলেন ইমান আলী।
দাশুড়িয়া মোড়ে শাকিল হাত তুলে ভ্যান থামায়। ১০০ টাকা ভাড়ায় চিনি মিলের দিকে যাওয়ার কথা বলে ভ্যানে ওঠে শাকিল ও সাকিব।
চিনি মিলের আগেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল মামুন ও রাসেল।
ভ্যান কাছে আসতেই শুরু হয় নৃশংস হামলা। হাতুড়ি ও চাকু দিয়ে একের পর এক আঘাতে লুটিয়ে পড়েন ইমান আলী। সাকিব দ্রুত ভ্যান নিয়ে পালিয়ে যায়।
তবুও ইমান আলী তখনো বেঁচে ছিলেন। প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছিলেন।
তিনজন মিলে আবারো আঘাত করতে থাকে। হাত-পা-মুখ বেঁধে রাস্তার পাশের জঙ্গলে চেপে ধরে রাখা হয় মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন ইমান আলী।
ভ্যানটি নিয়ে চারজন পালিয়ে কুষ্টিয়ার দিকে যায়। পরে ভ্যান বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেয় তারা।
পড়ে থাকে এক অসহায় ভ্যানচালকের নিথর দেহ।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply