ডলার সংকটের এ সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপে পড়েছে বেসরকারি খাত। তবে স্বল্পমেয়াদি নতুন বিদেশি ঋণ একেবারেই কমে গেছে। এতে করে বিদেশি ঋণের স্থিতি কমেছে তবে আগে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা হয়নি। গত ছয় মাসে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ ১৬৪ কোটি ডলার কমে ২ হাজার ৪৩১ কোটি ডলারে নেমেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ঋণ বাড়াতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইইবি, জাইকাসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। বেসরকারি খাতেও ঋণ বাড়াতে নানা উপায়ে উদ্বুদ্ধ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আগামীতে ডলার সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যেও। উদ্যোক্তারা আগ্রহী না হওয়ার প্রধান দুটি কারণ হলো বিদেশি ঋণের সুদহার এখন ৯ শতাংশের কাছাকাছি।
এক বছর আগেও যা ৩ থেকে ৫ শতাংশ ছিল। আবার গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন হয়েছে ২৫ শতাংশের মতো। আগামীতে আরও পতনের আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য চাইলেও অনেকে আগের মতো ঋণ পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বৈশ্বিক খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একেক সময় একেক রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডলারের বিপরীতে বেশি মুনাফা করায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসিসহ প্রথম সারির ১২টি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানকে সরানো, এমডিদের কাছে ব্যাখ্যা তলব এবং সর্বশেষ মুনাফার অর্ধেক সিএসআর খাতে ব্যয়ের নির্দেশনা অনেকের কাছে ভুল বার্তা গেছে। বিদেশি অনেক ব্যাংক ক্রেডিট লাইন কমিয়েছে। দেশের বাইরের অনেক ব্যাংক আগের মতো আর ঋণের মেয়াদ বাড়াতে চাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এখন বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণ সাধারণত এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি এবং ডলার সংকটের কারণে
বারবার পরিশোধের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বাড়লেও কমছে বেসরকারি খাতে। সব মিলিয়ে গত ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি। সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৪৯ কোটি ডলার। তিন মাস আগে যা ছিল ৬ হাজার ৭২৯ কোটি ডলার। বাকি ২ হাজার ৪৩১ কোটি ডলার রয়েছে বেসরকারি খাতে। তিন মাস আগে যা ২ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। আর গত জুন শেষে ছিল ২ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলার।
বেসরকারি খাতে ডেফার্ড পেমেন্ট তথা দেরিতে পরিশোধের শর্তে আমদানির ঋণ কমেছে সব চেয়ে দ্রুত। গত জুনের ডেফার্ড পেমেন্টের ঋণস্থিতি ছিল প্রায় ১০২ কোটি ডলার। ডিসেম্বরে তা কমে ৬৯ কোটি ডলারে নেমেছে। বিদেশি ব্যাক টু ব্যাক এলসি জুনের ১১৭ কোটি ডলার থেকে নেমেছে ৯০ কোটি ডলারে। বায়ার্স ক্রেডিট আগের প্রান্তিক তথা সেপ্টেম্বরের ১০২ কোটি ডলার থেকে কমে ৯৬ কোটি ডলারে নেমেছে। সাধারণত বিদ্যুৎ, জ্বালানি, তৈরি পোশাক, খাদ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমেন্ট, টোব্যাকোসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি ঋণ নিয়ে থাকেন উদ্যোক্তারা।
করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা এবং রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে বেশিরভাগ জিনিসের দর বেড়েছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে আমদানি কমেছে ২ দশমিক ২০ শতাংশ। আবার রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। রেমিট্যান্সে আড়াই শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি ছিল। এর পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত ৯৩০ কোটি ডলার বিক্রি করতে হয়েছে । গত অর্থবছর বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৬২ কোটি ডলার। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গত বুধবার ৩২ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ উঠেছিল সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার।