সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার এত কাজ করার পরও কিছু লোকের মন ভরে না। এরপরও তারা বলবে আওয়ামী লীগ নাকি কিছুই করে নাই। তিনি বলেন, ‘কিছুই করি নাই যারা বলে সেই শ্রেণিটা চোখ থাকতেও অন্ধ। তারা দেখবেই না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের মাথার ভেতরে নাই শব্দটা ঢুকে গেছে। আমরা নাইতে থাকতে চাই না। আমরা পারি, বাংলাদেশের মানুষ পারে। আমরা সেটাই প্রমাণ করতে চাই। নাই নাই শুনব না। আমরা করতে পারব, এটা করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বই তুলে দিয়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। রোববার (১ জানুয়ারি) সারা দেশে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক উৎসব হবে।
‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ। যেখানে প্রতিটি মানুষের প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকবে এবং দেশ বিশ্ব পরিমণ্ডলে পিছিয়ে থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা এবং লার্নিং যেমন ই-শিক্ষা, ই-স্বাস্থ্য, ই-ব্যবসা, ই-ইকোনমি, ই-গভর্নেন্স হবে প্রযুক্তিগত জ্ঞানভিত্তিক।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এরপর হবে স্যাটেলাইট-২। সেটাও আমরা করর। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে এসব দ্বীপাঞ্চল থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই আমরা ব্রডব্যান্ড অনলাইনে কাজ করার প্রযুক্তি নিয়ে যাব। একবারে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন হবে। সে ব্যবস্থাটাও আমরা করে দিচ্ছি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বর্তমান সরকার ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্যাপনের সময় উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। কাজেই বাংলাদেশকে এখন আর কেউ অবহেলার চোখে দেখতে পারে না। বাংলাদেশ বিশ্বে তার একটা স্থান করে নিয়েছে। আর ২০৪১ এর বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ, যেটা হবে স্মার্ট বাংলাদেশ।
করোনা মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে সব জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বিশ্বব্যাপী কষ্ট, তার মধ্যেও কিন্তু আমরা শিশুদের কথা ভুলিনি। তাদের বই ছাপানোর খরচাটা অন্যদিক থেকে আমরা সাশ্রয় করছি, বই ছাপানোর দিকে আমরা বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছি। পাশাপাশি কম্পিউটার শিক্ষা অর্থাৎ প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা কেন পিছিয়ে পড়ে থাকবে।’
করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনার সময় থেকে এখন পর্যন্ত আমার ঘর আমার স্কুল, অর্থাৎ এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ কাজেই ঘরে বসে পড়াশোনা চলে। কেউ যাতে পড়াশোনায় ফাঁকি দিতে না পারে সেই ব্যবস্থাই নেয়া হয়েছে। সংসদ টিভির মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে শিক্ষা কার্যাক্রম চালানো হয়েছে। আবার বিটিভির মাধ্যমেও চালানো হয়েছে। আমি মনে করি, সংসদ টিভি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব সময় ব্যবহার করতে পারে।’
শিক্ষার জন্য আলাদা টিভি চ্যানেল চালুর উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শিশুদের আন্তরিকতার সঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে বিশ্বের কোনো শক্তি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঠেকাতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পরে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা যে এ দেশের মানুষকে নিরক্ষরতামুক্ত করার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এটা জাতির জন্য দুঃখজনক। ১৯৯৬ সালে আমরা মানে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখন আমরা উদ্যোগ নেই, আমরা আবার নতুন করে শিক্ষা কমিশন গঠন করি। স্বাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করি। বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থাও সেখানে সংযুক্ত ছিল।’
তিনি বলেন, ‘জনগণকে যদি দারিদ্র্যমুক্ত করতে হয় তাহলে শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কাজেই সমগ্র জাতিকে আমরা শিক্ষিত করে গড়ে তুলব সেই পদক্ষেপ নেই। আমরা নতুন শিক্ষা কমিশন গঠন করি। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। কারণ আমাদের ৫ বছরের সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০০১-এ বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর তারা দেশকে আবার অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেয়। এটা হলো বাস্তবতা।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৮-এর নির্বাচনে নৌকা মার্কায় মানুষ ভোট দেয়, আমরা আবার সরকার গঠন করি। তখন থেকে আমাদের আবার লক্ষ্য হয়, কীভাবে আমরা এ দেশের মানুষকে নিরক্ষরতামুক্ত করব এবং ২০১০ সাল থেকে আমরা বিনামূল্যে বই বিতরণ শুরু করেছি।’
শিক্ষা সম্প্রসারণে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কৃষি, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ডিজিটাল, ইসলামি-আরবি, টেক্সটাইল, মেরিটাইম, এভিয়েশন ও এরোস্পেস, বেসরকারি ফ্যাশন ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এইসব সরকার করে দিয়েছে। বর্তমান সরকার চায় আকাশ গবেষণাটা করতেই হবে। এ সরকার চায় আমরা যেমন চাঁদে যেতে পারি, তেমনি যুদ্ধ জাহাজ এবং এরোপ্লেনও প্রস্তুত করবে দেশে। আর সেগুলো আমাদের ছেলে-মেয়েরা যাতে করতে পারে সেজন্য এ শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছি, তাছাড়া হাইটেক সিটি, হাইটেক পার্ক এবং সফটওয়্যার প্রযুক্তি পার্ক স্থাপন করেছি। তাছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রি সমমর্যাদা দেয়া হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি ভোকেশনাল শিক্ষা, কম্পিউটার এবং কারিগরি শিক্ষা যেন শিক্ষার্থীরা পেতে পারে সেজন্য সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, সাধারণ শিক্ষা ধারার ৬৪০টি প্রতিষ্ঠানে ২০২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভোকেশনাল কোর্স চালু করেছি, বর্তমানে ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের আধুনিকায়নের পাশাপাশি ১০০টি উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করছি, ৭০টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, ৩২৯টি উপজেলায় ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ২৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন চলমান, দুটি সার্ভে ইনস্টিটিউট নির্মাণাধীন রয়েছে। ২ হাজার ১৩৮টি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ২০ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষক/কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করেছি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টিই হচ্ছে সরকারের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি ৩০০ এলাকায় ৬টি করে মোট ১ হাজার ৮০০টি মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র ক্রয় চলমান, ৬৫৩টি মাদ্রাসার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করছি, মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, ৮ হাজার ১৫৪টি বেসরকারি মাদ্রাসা এবং ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬২ জন শিক্ষক/কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বছর থেকে ৩ হাজার ২১৪টি স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম ১ বছর থেকে বাড়িয়ে ২ বছর করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সময় শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি কোনো বই চাপিয়ে দেয়া হবে না। তারা খেলাধুলার মাধ্যমে আনন্দ নিয়ে শিখবে। এই ছোটবেলা থেকেই তাদের চিন্তা চেতনা যেন বিকসিত হতে পারে সেজন্যই এ ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইলবইসহ চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা ও সাদরি এই পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করছি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইলবইসহ, শেখার জন্য সিডি এবং পেন ড্রাইভ সরবরাহেরও পরামর্শ দেন তিনি। ছেলে-মেয়েদের আন্তরিকতার সঙ্গে গাইড করলে তারা তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে বলে অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে যতবেশি এই ছেলে-মেয়েদের গাইড করব, তারা ততবেশি দক্ষ হয়ে উঠবে।’
শিক্ষার্থীদের এই শীতে নিজেদের সুস্থ রাখার এবং ঘরবাড়িসহ আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধেরও পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন।
সূত্র: বাসস
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply