জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করার লক্ষ্যে দেশের বৃহৎ নদীগুলোর উপর দিয়ে সেতু নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০১৫ সালে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করার দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জাতির আস্থার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেশের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে তাদের মেধা, প্রজ্ঞা, সততা এবং নির্ভরশীলতার প্রতিফলন রেখে আসছে। একই সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কোন কোন কেপিআই এর নিরাপত্তা কাজেও সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত রয়েছে। যমুনা নদীর উপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর নিরাপত্তাকল্পে যেভাবে যমুনা পাড়ে গড়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস, সেভাবেই পদ্মার উভয় পাড়ে তৈরি হয়েছে শেখ রাসেল সেনানিবাস (মাওয়া-জাজিরা)। এরই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে সেতু বিভাগের সাথে সমন্বয়পূর্বক পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণশৈলীতে ইঞ্জিনিয়ার পরামর্শক নিয়োগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক সম্পাদিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা দায়িত্বগুলো হলো—মাওয়া প্রান্তে ৭৭ বর্গকিলোমিটার ও জাজিরা প্রান্তে ১৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তা বিধান এবং সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে ৬ কিলোমিটার নদীপথ প্রত্যক্ষভাবে নজরদারিতে রাখা এবং সেতুর নির্মাণ কার্য সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি ব্যক্তিবর্গের, শ্রমিকদের, আগত অতিথিবৃন্দের এবং সকল সরঞ্জামাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং সেতু কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি:
জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক মূল্যায়নে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি বাংলাদেশের এই পর্যন্ত সর্ববৃহৎ ভৌত অবকাঠামো। এই সেতুর সাথে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতি হিসেবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প প্রভাষিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মা সেতুর উপর নির্মাণকালীন এবং নির্মাণ পরবর্তী যেকোনো ঝুঁকি বা হুমকি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচ্য। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সাথে শুধু সংযোগই করবে না, এটি এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ককে যুক্ত করবে। অন্যদিকে, পায়রা ও মংলা বন্দরসহ দক্ষিণের সকল উৎপাদনশীল কল-কারখানা, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি সংযোগ জাতীয় অর্থনীতি উন্নয়নে অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে। কাজেই বাংলাদেশের অহঙ্কার এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের বাহক এই বৃহৎ প্রকল্পের উপর নির্মাণকালীন এবং নির্মাণ পরবর্তী নাশকতা পরিকল্পনার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি (সর্বোচ্চ ১২৯৬ জন বিদেশি নাগরিক একই সময়ে ছিলেন) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ক্ষতিসাধন, প্রকল্প এলাকার ভেতর শ্রমিক অসন্তোষ, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অতিমূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী ও সরঞ্জামাদি পাচার অথবা ক্ষতিসাধন, সেতু সংলগ্ন অথবা নদীশাসন এলাকা হতে অবৈধ বালু উত্তোলন, ব্রিজের পিলারে নৌযানসমূহের ধাক্কা, প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে মাদকের প্রভাব ইত্যাদি সম্ভাব্য ঘটনাসমূহ প্রকল্পের উপর প্রত্যক্ষ হুমকি ছিল। এর পাশাপাশি পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং তদসংলগ্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, প্রকল্পের মালামাল পরিবহনে যানযট এবং অবৈধ চাঁদা আদায়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, শীতকালে নদীর নাব্যতা হারানোর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজকে বিঘ্নিত করার সম্ভাবনা ছিল।
এ সকল বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে এ নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়, যার উল্লেখযোগ্য অংশ হলো—মাওয়া ও জাজিরা এলাকায় স্থাপিত ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ভূমিতে এবং নদীতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি এবং সরঞ্জামাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি ও অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করবে এবং দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল ও নৌ টহল পরিচালনা করবে। মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে এবং নদীপথে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি করে ইমারজেন্সি রেসপন্স দল প্রস্তুত থাকবে এবং সেতু কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়পূর্বক প্রকল্প এলাকার বাইরে যেকোন অনভিপ্রেত ঘটনা যা সেতু প্রকল্পের নির্মাণ কাজে প্রভাব ফেলতে পারে তা নিরসনের জন্য সকল কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানকল্পে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে দুটি অস্থায়ী সেনানিবাস স্থাপন করা হয়। গত ২৯ মে ২০২২ তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাজিরা প্রান্তে ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’ নামে একটি স্থায়ী সেনানিবাসের উদ্বোধন করেন। এই সেনানিবাস ভবিষ্যতেও পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সেতু কর্তৃপক্ষের সাথে চুক্তি মোতাবেক সেনাবাহিনী কর্তৃক সম্পাদিত নিরাপত্তার দায়িত্বসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে তুলে ধরা হলো।
(১) মাওয়া-জাজিরা ও নদীপথে নিরাপত্তা প্রদান: মাওয়া প্রান্তে অবস্থিত পদাতিক ব্যাটালিয়নটি মাওয়া প্রান্তে ১ নং পিলার হতে ধলেশ্বরী ব্রিজ পর্যন্ত ৭৭ বর্গকিলোমিটার এবং জাজিরা প্রান্তের পদাতিক ব্যাটালিয়ন পদ্মা ব্রিজের ৪১ নং পিলার হতে পাঁচ্চর পর্যন্ত ১৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দিনে ও রাতে সার্বক্ষণিক সরাসরি নজরদারির মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে। অন্যদিকে, রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন ব্রিজের পূর্বে এবং পশ্চিমে ৬ কিলোমিটার নদীপথের নিরাপত্তা বিধান করে আসছে।
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply