[ঢাকা, অক্টোবর ১০, ২০২৬] আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি’র সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড এর উদ্যোগে সম্প্রতি ‘আইডিএলসি ক্যাপিটাল মার্কেট কনক্লেভ ২০২৬’ শীর্ষক এক আলোচনার আয়োজন করা হয়। রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে এ শনিবার (অক্টোবর ১০) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ এবং টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রসঙ্গে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পরিসর বৃদ্ধি করা এবং আরো উন্নত ভারসাম্যপূর্ণ একটি আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে করনীয় নিয়ে আর্থিক খাতের সম্মানিত নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক, ব্যাংক সহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজারের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, করপোরেট সুশাসন, ও ব্যবসায়িক সাফল্যের ধারাবাহিক রেকর্ড রয়েছে– এমন বড় প্রতিষ্ঠান এবং স্বনামধন্য ব্র্যান্ডগুলোর পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে একে আরও সমৃদ্ধ করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) ও সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডিরেক্ট লিস্টিং)-এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা, বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো, বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদারের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি’র চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম জামাল উদ্দিন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, বিএসইসি কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
স্বাগত বক্তব্যে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম জামাল উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি যত এগিয়ে যাচ্ছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের চাহিদাও তত বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে অর্থায়নের বিকল্প উৎসের গুরুত্বও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংক খাত সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা গেলে ব্যাংক খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে”।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, “আমরা চাই, কোম্পানিগুলো বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বপ্রণোদিত হয়ে পুঁজিবাজারে আসুক এবং এর সুফল ভোগ করুক। আমরা ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। শেয়ারবাজারে আসার বিষয়টি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা উচিত”।
আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার বলেন, “ব্যক্তিপর্যায়ে সঞ্চয় করেন, কিন্তু পুঁজিবাজার সম্পর্কে ধারণা ও বিশ্বাস কম – বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরণের সঞ্চয়কারীরা মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর নির্ভর করেন। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ভালো চর্চা গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে তারা ফিক্সড ডিপোজিটের দিকে ঝোঁকেন, কিন্তু এখন সেখানেও মুনাফার হার এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। এই শ্রেণীর সঞ্চয়কারীদের জন্য আমাদের শেয়ারবাজার খাতটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শেয়ারবাজারে সব বিনিয়োগকারীই যে ঝুঁকি নিতে চান, তা কিন্তু নয়। অনেক মানুষই নিরাপদ মুনাফা চান, যা ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের সুদের হারের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে। শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।“
আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “অর্থায়নের তিনটি মূল উৎস বন্ড, ইক্যুইটি এবং ব্যাংকঋণ এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় প্রায় ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে এই নির্ভরতার হার প্রায় ৫৩ শতাংশ, এবং উন্নত বাজারগুলোতে ব্যাংকনির্ভরতার হার কেবলমাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। একই সময়ে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাজারমূলধনও সবচেয়ে কম। আমরা বলছি না যে ব্যাংকনির্ভরতা খারাপ। ব্যাংক খাতের অর্থায়নের মাধ্যমেই আমাদের অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন, এমনকি জিডিপি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান এসেছে। তবে আমাদের একটি আরো নির্ভরযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক কাঠামো গড়ার লক্ষ্যে কাজ করা প্রয়োজন”।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে আমাদের বাজার মূলধন জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বা তারও কম। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা এটা জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছি। ফলে বন্ড ও সরকারি সিকিউরিটিজসহ আমাদের বাজারের আকার বর্তমানের ৩০ বিলিয়ন ডলার (ইকুইটি) থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এটা অবশ্যই সম্ভব। তবে এর জন্য সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ, আস্থা ও বিশ্বাস প্রয়োজন।’
এছাড়াও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের হেড অব ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং মো. রাশিদুজ্জামান এবং সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (সাবিনকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মারুফুর রহমান মজুমদার মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন।
আয়োজনের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল ‘রিথিংকিং দ্য ব্যালান্স শিট: ডাইভার্সিফাইং করপোরেট ফাইন্যান্সিং’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তাদের অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে পারে এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে উপযুক্ত অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে প্যানেলে তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা হয়। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার মূল্য বাড়াতে করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কার্যকর আর্থিক কাঠামোর গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কনক্লেভটি শেষ হয়।