মোঃ আব্দুল্লাহ হক, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গায় বিচারিক কার্যক্রম আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে পুলিশ ও বিচার বিভাগের সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালত ভবনের সম্মেলন কক্ষে এ কনফারেন্সের আয়োজন করে চুয়াডাঙ্গার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
কনফারেন্সে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের চিফ মো. শাহজাহান আলী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লাভলী নাজনীন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন,
“পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্সের মূল উদ্দেশ্য হলো বিচারিক সেবাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করা। সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”
তিনি দ্রুত বিচারিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন,
“সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা চাই বিচার প্রক্রিয়া সহজ, সঠিক ও স্বচ্ছ হোক, যাতে জনগণ কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়।”
জেলা পুলিশের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন,
“মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দাখিল করতে হবে। মাদকসহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে কাউকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কনফারেন্সে চুয়াডাঙ্গার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
“মাদক মামলার আসামিরা দ্রুত জামিন পাচ্ছে। স্বর্ণ ও মাদকের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। জনগণের দোরগোড়ায় জবাবদিহিমূলক বিচার পৌঁছে দিতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত অগ্রগতি শেয়ার করা হয় না এবং সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানবিরোধী মামলায় যথাযথ আইনি ধারা প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীরা রিমান্ড শেষে কয়েক মাস জেল খেটে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন,
“মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের গ্রেফতার করা হলেও আইনি কারণে দ্রুত মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে আমরা নিরলস কাজ করছি। মাদক ও চিহ্নিত অপরাধীদের দীর্ঘ সময় আটক রাখা গেলে সমাজে শান্তি ফিরে আসবে।”
দামুড়হুদা থানার ওসি শেখ মেসবাহ উদ্দিন বলেন,
“ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনি প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”
জীবননগর থানার ওসি সোলাইমান শেখ বলেন,
“মাদক মামলার অনেক আসামি দুই-তিন দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।”
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রাজ মাহমুদ বলেন,
“ফেনসিডিলসহ মাদক চোরাচালানের বিষয়ে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং মাদক, স্বর্ণসহ সব ধরনের অবৈধ পণ্য প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে আছে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চুয়াডাঙ্গার উপ-পরিচালক বলেন,
“মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলবে।”
চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন,
“পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের কাছে আইনি সেবা পৌঁছে দিতে পুলিশ ও আদালত একসঙ্গে কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং আমরা সব বিষয়ে সজাগ রয়েছি।”
সভাপতির বক্তব্যে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহজাহান আলী বলেন,
“বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। মামলার আলামত থানায় না রেখে দ্রুত মালখানায় পাঠাতে হবে এবং সিআর মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তির বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“বিচার কার্য পরিচালনায় বিদ্যমান সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়েই এই কনফারেন্সের উদ্দেশ্য সফল হবে।”
কনফারেন্সে বিচারিক ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল— সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল, সাক্ষীর নিরাপত্তা, তদন্তে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ, সময়মতো মেডিক্যাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তি, আদালতে আলামত উপস্থাপন, বিচারাধীন আসামিদের হাজিরা নিশ্চিতকরণ, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেসির সমন্বয় বৃদ্ধি, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রবেশন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা।
এ সময় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এস এম শাহজাহান মুকুল, সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক গোলাম ছবুর খান, জেলা গোয়েন্দা শাখার পুলিশ পরিদর্শক এএইচএম কামরুজ্জামান খান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার মো. ছানোয়ার হোসেন, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. আমিরুল ইসলাম, আলমডাঙ্গা থানার ওসি বানি ইসরাইল, দর্শনা থানার ওসি মো. হিমেল রানা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মামুনুল হাসান, চিকিৎসক ডা. শামীমা ইয়াসমিন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ বিচার বিভাগ ও জেলা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।