১. সময়টা বড় অসময়। জানালার বাইরে তাকালে দেখি মেঘে ঢাকা আকাশ, আর অন্তরের ভেতরে তাকলে দেখি এক অন্তহীন কুয়াশা। আমরা কোন করাল গ্রাসের দিকে ধাবিত হচ্ছি? আশির দশকে যখন সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম, তখন নদ-নদী আর খাল-বিলের জল ছিল অনেকটাই স্বচ্ছ, আর এদেশের মানুষের মনও ছিল অনেকাংশে কলুষহীন। আজ নদ-নদী আর খাল-বিলের জলও দখল-দুষণে অনেকটাই কালো, আর আমাদের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশের বিবেক আজ এক মায়াবী ডিজিটাল অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গাটি কোথায় জানেন? আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির তরুণ সমাজ- যারা একদিন বায়ান্নর রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, যারা একাত্তরে রাইফেলের নলে নতুন সূর্য এনেছিল, যারা নব্বই ও চব্বিশে স্বৈরাচার হটিয়েছিল, আজ তাদের একটা বড় অংশ অবক্ষয়ের এক চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। সেই চোরাবালির আধুনিক নাম- অনলাইন জুয়া। এটি কেবল কোনো সাময়িক বিচ্যুতি নয়, এটি একুশ শতকের বুকে চেপে বসা এক করাল সামাজিক ক্যানসার। যে ব্যাধি নিঃশব্দে, অত্যন্ত সুচতুর উপায়ে আমাদের সমাজ- সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করছে।
২. আজ যখন দেশের খবরের কাগজগুলোর দিকে চোখ বুলাই, বুকটা কেঁপে ওঠে। কলাম লিখতে গিয়ে বারবার আঙুল থমকে দাঁড়ায়। কিছুদিন আগে এক মর্মান্তিক খবর পড়লাম। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, অনলাইন জুয়ার দেনা শোধ করতে না পেরে নিজের শোবার ঘরে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার আগে সে ডায়েরিতে লিখে গেছে, ‘মা, আমাকে ক্ষমা করো। মাত্র কয়েক হাজার টাকা জেতার লোভে ঢুকেছিলাম, আজ আমি লাখ টাকার ঋণী।’ কী ভয়ানক এই মায়াজাল! এই জুয়াকে আমরা তুলনা করতে পারি গ্রিক পুরাণের সেই কুখ্যাত জলপরী বা ‘সাইরেন’দের (ঝরৎবহং) সাথে। সাগরের মাঝে পাথুরে দ্বীপে বসে সাইরেনরা এমন এক মায়াবী, মোহনীয় সুরে গান গাইত যে, দূর থেকে নাবিকেরা সেই সুরের মায়ায় অন্ধ হয়ে জাহাজের দিক পরিবর্তন করত। তারা ভাবত, সামনে বুঝি কোনো স্বর্গীয় সুখ অপেক্ষা করছে। কিন্তু জাহাজটি যখনই সেই দ্বীপের কাছে যেত, ধারালো পাথরের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে সাগরের বুকে তলিয়ে যেত। নাবিকদের হাড়গোড় দিয়ে ভরে থাকত সেই দ্বীপ। আজকের অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো (যেমন- এক্সবেট, মেলবেট কিংবা লাইনবেট ইত্যাদি) একেকটি আধুনিক সাইরেন। তারা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চটকদার বিজ্ঞাপন, ঝকঝকে ইন্টারফেস আর ‘রাতারাতি কোটিপতি’ হওয়ার মোহনীয় সুর বাজাচ্ছে। আমাদের বেকার, হতাশ আর সহজ সরল তরুণরা সেই সুরের মায়ায় অন্ধ হয়ে নিজেদের জীবনের জাহাজটি ছুড়ে দিচ্ছে এক নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে। প্রথমবার হয়তো দু-এক হাজার টাকা জিতে তারা উল্লসিত হয়, ভাবে এই তো ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি! কিন্তু তারা জানে না, এটি আসলে পাতা কুড়ানোর মতো ফাঁদ। ভেতরের দেয়ালটা এতই পিচ্ছিল যে, একবার পা হড়কালে অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
৩. পরিসংখ্যানের ভাষা বড় নির্মম হয়। তা কোনো আবেগ বোঝে না, শুধু রূঢ় সত্যটা চোখের সামনে তুলে ধরে। দেশের বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদদের সাম্প্রতিক গবেষণায় যে হাড়হিম করা তথ্য উঠে এসেছে, তা দেখে চুপ করে থাকা আর আত্মহত্যার শামিল। (ক) তরুণ প্রজন্মের পতন: এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মরণনেশায় আক্রান্ত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশেরই বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, ল্যাপটপ কিংবা খেলার মাঠের ফুটবল; আজ সেই বয়সে তাদের আঙুল ব্যস্ত স্মার্টফোনের স্ক্রিনে জুয়ার দান চালতে। (খ) অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ: আমরা প্রায়শই ডলার সংকট আর রিজার্ভের টানাপোড়েন নিয়ে বড় বড় টকশোতে বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনি। কিন্তু পর্দার আড়ালের মূল সত্যটা কয়জন তুলে ধরেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর এই দেশ থেকে হুন্ডি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের টাকা ডলারে রূপান্তরিত হয়ে চলে যাচ্ছে রাশিয়া, সাইপ্রাস কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশের জুয়াড়ি চক্রের পকেটে। এটি জাতীয় অর্থনীতির ধমনী কেটে রক্ত চুষে খাওয়ার শামিল। (গ) মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কলঙ্ক: এক সময় আমরা গর্ব করে বলতাম, মোবাইল ব্যাংকিং আমাদের প্রান্তিক মানুষের জীবন সহজ করেছে। অথচ আজ কী দেখছি? বিকাশ, রকেট কিংবা নগদের মতো জনপ্রিয় সেবার প্রায় লক্ষাধিক এজেন্ট এবং ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট আজ অনলাইন জুয়ার টাকা লেনদেনের অবৈধ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে শত কোটি টাকার জুয়ার টাকা লেনদেন হচ্ছে এই মাধ্যমে- যা দেশের ব্যাংকিং খাতকে এক চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। (ঘ) অপরাধের নতুন সমীকরণ: জুয়া আর অপরাধ চিরকালই যমজ ভাইয়ের মতো। সাম্প্রতিক অপরাধ বিজ্ঞানের এক জরিপে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে সংঘটিত ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা এবং চুরির ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের পেছনে রয়েছে জুয়ার দেনা শোধের তাগিদ। এমনকি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে পারিবারিক অশান্তি, কলহ এবং বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী এই অনলাইন জুয়া।
৪. কেন এই মহামারি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর পুঁজিবাদী চক্রান্ত এবং আমাদের নীতিনির্ধারকদের চরম উদাসীনতা। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, দেশের নামী-দামী ক্রিকেটার, সিনেমার তারকা, এমনকি তথাকথিত ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’রা বুক ফুলিয়ে এই জুয়ার অ্যাপগুলোর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। যে তারকাদের দেখে একটা শিশু বড় হতে চায়, সেই তারকাই যখন জুয়ার প্রলোভন দেখায়, তখন নৈতিকতার দেয়ালটা ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয়েছে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং কর্মসংস্থানের চরম অভাব। একটা ছেলে যখন পাস করে বছরের পর বছর চাকরি পায় না, তখন তার ভেতরে যে হতাশা জন্ম নেয়, পুঁজিবাদী জুয়ার চক্র সেই হতাশাকেই পুঁজি করে। তারা বোঝায়, ‘পরিশ্রমের দরকার নেই, শুধু বুদ্ধির জোরেই তুমি বড়লোক হতে পারো।’ এই ‘শর্টকাট’ বা সহজ পথের লোভই আমাদের সমাজকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আমাদের বীরমুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিল একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। আজ যদি সেই সমাজের তরুণরা জুয়ার টেবিলে নিজেদের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখে, তবে সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? মৌলবাদ যেমন আমাদের সমাজকে অন্ধকারের দিকে টানে, এই ডিজিটাল জুয়াও তেমনি আমাদের তরুণদের মেধা ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে এক পঙ্গু প্রজন্ম তৈরি করছে।
৫. তাহলে মুক্তির উপায় কী? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’ আজ সময় এসেছে রাষ্ট্রকে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে এই ব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। কেবল লিপ-সার্ভিস বা দু-একটি সেমিনার করে এই মহামারি বন্ধ করা যাবে না। প্রথমত, অনলাইন জুয়াকে কঠোর ‘সাইবার অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে এর সাথে জড়িত মূল হোতা, দেশের ভেতরের এজেন্ট এবং প্রমোটার তারকাদের জন্য আমৃত্যু কারাদ- বা সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিটিআরসি (BTRC)-কে কেবল কাগুজে বাঘ হয়ে থাকলে চলবে না। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে জুয়ার সমস্ত সাইট, প্রক্সি সাইট এবং অ্যাপস বাংলাদেশ ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে ব্লক করতে হবে। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কোনো এজেন্টের মাধ্যমে যদি জুয়ার টাকা লেনদেন হয়, তবে সেই এজেন্টের শুধু লাইসেন্স বাতিল নয়, তাকেও অপরাধের অংশীদার হিসেবে গ্রেপ্তার করতে হবে।
তবে আশার কথা, গত ৩০ জুন(মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এ আইনের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, ১৮৬৭’ রহিতকরণ করা হয়েছে। আইনে জুয়া, অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং (বাজি বা পণ), বাজিকর (Bookmaker), ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট, ভিপিএনসহ মোট ২৪ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের কারাদ-, অর্থদ-অথবা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। তারপরও শুধুমাত্র আইনই যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন এর সঠিক ও সক্রিয় প্রয়োগ।
সর্বোপরি, আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে। মা-বাবাদের অনুরোধ করব, আপনার সন্তানকে শুধু দামি স্মার্টফোন কিনে দিয়েই দায়িত্ব শেষ ভাববেন না। সে ইন্টারনেটে কী করছে, কার সাথে মিশছে, তার আচমকা টাকার প্রতি লোভ বাড়ছে কি না- সেদিকে নজর রাখুন। সংস্কৃতির সুবাতাস ফিরিয়ে আনতে হবে পাড়ায় পাড়ায়। খেলার মাঠগুলোকে উদ্ধার করতে হবে, তরুণদের কিতাবমুখী ও সংস্কৃতিমুখী করতে হবে।
৬. ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না। আজ আমরা যদি এই সামাজিক ক্যানসারকে অবহেলা করি, তবে আগামি প্রজন্ম আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আমরা কি একটি জুয়াড়ি, নীতিহীন এবং পঙ্গু প্রজন্মের অভিভাবক হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হতে চাই? নিশ্চয়ই না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটাই হোক আমাদের শপথ- আসুন, দল-মত নির্বিশেষে অনলাইন জুয়ার এই সর্বনাশা মায়াজালের বিরুদ্ধে এক অভেদ্য সামাজিক দুর্গ গড়ে তুলি। প্রশাসনকে দেখাত হবে ‘জিরো টলারেন্স’। তবেই বাঁচবে আমাদের তরুণ সমাজ, তবেই সার্থক হবে আমাদের পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগ, আর তবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।