
বর্তমান বিশ্ব আজ এমন এক জটিল মেরুকরণের মুখোমুখি, যেখানে প্রতিটি শক্তিশালী রাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধ (Shadow War) থেকে সরাসরি সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী গত ৮০ বছরে বিশ্ব আর কখনো এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি।
** মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভে ইরান বনাম ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র:- ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মাথাব্যথার কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর (হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি) ওপর ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলা পরিস্থিতিকে বিষিয়ে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের প্রতি একতরফা সমর্থন ইরানকে রাশিয়ার আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের ওপর কোনো সরাসরি হামলা হলে তা চীন ও রাশিয়াকে সরাসরি যুদ্ধে টেনে আনবে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট্ তৈরি করবে।
** রাশিয়া-ইউক্রেন ও ন্যাটোর রণকৌশল:- বিগত চার বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর অস্ত্র সহায়তা ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখলেও এটি রাশিয়াকে এক চরম প্রতিশোধপরায়ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। ভ্লাদিমির পুতিন বারবার পারমাণবিক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং তারাও পাল্টাপাল্টি সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
** নতুন ফ্রন্টে ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকা:- ২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ এবং রুশ তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করছে, সমালোচকরা একে দেখছেন আধিপত্য বিস্তারের এক নগ্ন রূপ হিসেবে। এর ফলে রাশিয়া ও চীন লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রভাব বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
** চীন-উত্তর কোরিয়া ও ভারতের অবস্থান:-
* চীন ও তাইওয়ান পরিস্থিতি:- দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক মহড়া এবং তাইওয়ান দখলের আকাঙ্ক্ষা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।
* উত্তর কোরিয়ার অবস্থান:- কিম জং উনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং রাশিয়ার সাথে সরাসরি সামরিক চুক্তি বিশ্বকে এক ভয়াবহ পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
* ভারত ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট্:- দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাও আজ সংকটের মুখে। ভারত একদিকে রাশিয়ার সাথে জ্বালানি ও সামরিক সম্পর্ক রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক নীতি ভারতের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো এই পরাশক্তিদের ক্ষমতার লড়াইয়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
** বিশ্ব রাজনীতির ভাগ্যবিধাতা কি এখন কেবল-ই দম্ভ?- বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা- সেমিনারের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে কেবলমাত্র মৌখিক মানবাধিকার ও বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার বুলি আওড়ালেও ক্ষমতাধর পরাশক্তিধর দেশগুলো আজ কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় মত্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বিশ্ব ব্যবস্থাকে (Global Order) ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে। যখন নিয়ম-নীতি কাজ করে না, তখন কেবল ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এই নীতিই প্রতিষ্ঠিত হয়।
নিরাপক্ষ দৃষ্টির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাই যে, এই পৃথিবী নামক মায়াবী গ্রহটি কি মানুষের বসবাসযোগ্য থাকবে, না কি পারমাণবিক ছাঁইয়ে ঢাকা পড়বে?- তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রতিহিংসার আগ্নেয়গিরি যদি একবার বিস্ফোরিত হয়, তবে জয়ী বা বিজয়ী বলে কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। মানব সভ্যতা আজ ইতিহাসের এমন এক পাতায় দাঁড়িয়ে যেখানে ‘শান্তি’ কেবল একটি শব্দে পরিণত হয়েছে প্রকৃত বিশ্ব জনমতের বিবেকীয় মানবতার অবাক বিস্ময়ের চোখে ভাষাহীন শব্দের আওয়াজে বোবা কাঁন্না আর কন্ঠরোধ আর্তনাদে!
Design & Developed By: ECONOMIC NEWS
Leave a Reply