আরবি মাসের গুরুত্বপূর্ণ এক মাস শাবান। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য কিছু মাস পুরস্কার ও মহিমান্বিত করেছেন। তার মধ্যে শাবান মাস অন্যতম। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসকে তার নিজের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তিনি শাবান মাসে রোজা পালনের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন। শাবান এমনই ফজিলতপূর্ণ মাস; যে মাসে আল্লাহ তাআলা তার রহমত ও বরকতের মাধ্যমে বান্দার সব চাহিদা পূরণ করেন।
আর যে ব্যক্তি এমাস পাবে, সে আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হবে। শাবান মাসের ইবাদাত-বন্দেগির মধ্যে রোজার গুরুত্ব বেশি হওয়ায় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন।
শাবানের এক তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত রোজা পালনের বিশেষ ফজিলতের কথা বিভিন্ন হাদিসে ও উম্মাহুতুল মুমিনিনগণের বক্তব্যে পাওয়া যায়।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখতে থাকতেন, যাতে আমরা বলতাম যে, তিনি (এ মাসে) আর রোজা ছাড়বেন না; আবার তিনি রোজা ভাঙ্গতে শুরু করতেন, যাতে আমরা বলতাম যে, তিনি (এ মাসে) আর রোজা রাখবেন না।
আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান মাস ছাড়া আর কখনো পূর্ণ মাস রোজা রাখতে দেখিনি। আর তাকে শাবান মাস ব্যতীত কোনো মাসে এতো বেশি রোজা রাখতেও দেখিনি।
আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাত মানুষের জন্য আনয়ন করেন। প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক ও মুশাহিনকে ক্ষমা করেন না। (মুশাহিন বলা হয় এমন মানুষকে, যারা সুন্নাহর বিরোধিতা করেন আর সাহাবা রা. কে অভিসম্পাত করেন)। (সিলসিলাতু আহাদিস- আস-সাহিহা- ১১৪৪)
অপর বর্ণনায় এসেছে, তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ শাবানের পূর্ণ মাসই রোজা রাখতেন। তিনি শাবানের রোজা রাখতেন তবে অল্প কিছু দিন (রাখতেন না)। (বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকি, আবু দাউদ, মিশকাত)
মহানবি সা. শাবানকে নিজের মাস বলে অভিহিত করেছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত এক হাদিসে নবি করিম সা. বলেন, রজব হলো আল্লাহর মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর মাস রজবকে সম্মান করল, সে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। আর যে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, মহান আল্লাহ্ তাকে জান্নাতুন নাঈমে প্রবেশ করাবেন। আবার শাবান হলো আমার মাস। আর যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল সে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। আর যে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, কিয়ামতের দিন আমি হব তার অগ্রবর্তী এবং সওয়াবের ভাণ্ডার। আর রমজান মাস হলো আমার উম্মতের মাস। এই মাসে নবি করিম সা. বেশি বেশি করে এই বরকতময় দোয়া পাঠ করতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসে বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন। (মুসনাদে আহমদ প্রথম খণ্ড ২৫৯, শুআবুল ঈমান ৩৫৩২)।
নবী কারিম সা. শাবান মাসের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যের বিবেচনায় এ মাসে অধিক হারে নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন। রমজানুল মুবারকের মর্যাদা রক্ষা এবং হক আদায়ের অনুশীলনের জন্য রসুলুল্লাহ সা. শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা পালন করতেন। এ সম্পর্কে হজরত আনাস রা. বলেছেন, নবী করিম সা.-কে জিগ্যেস করা হলো আপনার কাছে মাহে রমজানের পর কোন মাসের রোজা উত্তম? তিনি বললেন, রমজান মাসের সম্মান প্রদর্শনের জন্য শাবানের রোজা উত্তম। (তিরমিজি)
হযরত উসামা রা.0 বলেন, একবার আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ মাসে (শাবান) বেশি বেশি রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তরে বললেন, লোকেরা রজব ও রমজান এ দুই মাসের গুরুত্ব বেশি দেয়। রোজাও রাখে। কিন্তু মধ্যবর্তী এ মাসটিকে উপেক্ষা করে চলে। অথচ এ মাসেই বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হয়।
আর আমার কামনা হলো- আমার আমলসমূহ আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করার সময় আমি রোজা অবস্থায় থাকি। এ কারণেই আমি শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখি। (নাসাঈ, আবু দাউদ)
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ১৫ শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে, সে রাতে তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং পরদিন রোজা রাখ। (ইবনে মাজাহ)
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, শাবান হচ্ছে আমার মাস, যে কেউ এ মাসে আমাকে সাহায্য করবে আল্লাহ তাআলা তার ওপর বিশেষ রহমত ও বরকত নাজিল করবেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা বলতে তার সুন্নতের ওপর আমল করাকেই বুঝান হয়েছে।
তিনি শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা পালনের পাশাপাশি ইসতেগফার ও দরুদ শরিফ পাঠের কথা উল্লেখ করে বলেন, হিজরি বছরের তিনটি মাস তথা রজব, শাবান ও রমজান; এ তিনটি মাসেই অধিক ইস্তেগফার ও দরুদ শরিফ পাঠের সুপারিশ করা হয়েছে। অবশ্য তন্মধ্যে শাবান মাসের ওপর বেশি তাগিদ দেয়া হয়েছে।
মুহাদ্দিসিনে কেরামদের একটি মতামত দিয়ে শেষ করতে চাই- রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত স্ত্রীগণের মধ্য থেকে যাদের রমজানের রোজা ছুটে যেতো। সে রোজাগুলো তারা সারা বছর কাজা করার সুযোগ পেতেন না এবং শাবান মাসেই ভাংতি রোজাগুলো কাজা করতেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সঙ্গে রোজা রেখেই মাসটি অতিবাহিত করতেন।
Leave a Reply