ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশের নদীবেষ্টিত দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের জন্য দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। যাত্রা শুরুর পর থেকে হাসপাতালটি এখন পর্যন্ত ৮ লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছে। এ সময়ে প্রদান করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যসেবা। এর মধ্যে রয়েছে ৪৮৯টি সার্জিক্যাল ক্যাম্প ও ১৯ হাজারের বেশি অস্ত্রোপচার। গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের দুর্গম চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভাসমান এই হাসপাতালের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী এই উদ্যোগের কার্যক্রম ও এর অগ্রগতি সরেজমিনে দেখতে সম্প্রতি গাইবান্ধায় লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুহুল কুদ্দুস খান এবং প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যরা। পরিদর্শনকালে প্রতিনিধিদল হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামো ঘুরে দেখেন, স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করবেন, রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গেও কথা বলেন। পাশাপাশি, দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা সম্পর্কেও ধারণা নেন।
ইউনিলিভারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্র্যান্ড লাইফবয় এবং সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ-এর দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল ইউনিলিভার বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সামাজিক উদ্যোগগুলোর একটি। ২০০২ সালে ফ্রান্স থেকে আনা একটি বার্জকে পূর্ণাঙ্গ ভাসমান হাসপাতালে রূপান্তরের মাধ্যমে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের দুর্গম এলাকায় প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালটি একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসাও দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ চিকিৎসা, চক্ষুসেবা, দন্ত ও চর্মরোগের চিকিৎসা, বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এসব অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাওয়া যেখানে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে হাসপাতালটি নিয়মিতভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
এই উদ্যোগের সুফল ক্রমেই আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালেই হাসপাতালটি ৪৮ হাজার ৭৮৪ জন রোগীকে সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৩৬ হাজার ৫১টি সাধারণ বহির্বিভাগীয় পরামর্শ, ৪ হাজার ৪৪২টি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, ৯৮৭টি অস্ত্রোপচার এবং ২১ হাজার ৫০০টি রোগ নির্ণয়সংক্রান্ত পরীক্ষা। একই বছরে হাসপাতালটি ২৮ হাজার ২৭৩ জন নারী ও কিশোরী এবং ৬ হাজার ৫৬৪ জন শিশুর কাছেও সেবা পৌঁছে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ছিল ৯৮ শতাংশ এবং রোগী সন্তুষ্টির হার ছিল ৯৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের চরাঞ্চলে বসবাসকারী অনেককেই স্বাস্থ্যসেবার নাগাল পেতে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ নৌপথ। সীমিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে সময় ও অর্থের অপচয় হয়। বর্ষাকালে বন্যা, নদীভাঙন ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা সময় মতো চিকিৎসা পাওয়ার পথে প্রায়ই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে মানুষের কাছে সরাসরি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধিদল রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সরাসরি তাদের অভিজ্ঞতার কথা শোনেন। তারা জানান, বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ফলে নৌপথে দীর্ঘ ও কষ্টকর যাতায়াতের প্রয়োজন কমেছে; সেই সাথে চিকিৎসার ফলাফল উন্নত হয়েছে এবং প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা নেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিদর্শনকালে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুহুল কুদ্দুস খান বলেন, “ইউনিলিভারে আমরা বিশ্বাস করি, সুস্বাস্থ্য মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একজন মানুষ সুস্থ হয়ে উঠলে তার সুফল শুধু তার নিজের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো পরিবারে ফিরে আসে স্বস্তি ও স্বাভাবিকতা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলের লাখো মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারা ইউনিলিভারের জন্য সত্যিই গর্বের। রোগী, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়। এটি মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনে এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করে। ফ্রেন্ডশিপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে কাজ করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে, যাতে আরও বেশি মানুষ প্রয়োজনের সময়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।”
এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে ইউনিলিভার বাংলাদেশ ও ফ্রেন্ডশিপ-এর দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও বিস্তৃত করার অভিন্ন প্রতিশ্রুতিকে আরও দৃঢ় করেছে। ধারাবাহিক সহযোগিতা, উদ্ভাবন ও সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগের মাধ্যমে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যাতে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে থাকা মানুষের কাছেও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।