গত এক বছরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রা মার্কিন ডলারের বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হলেও ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশের টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলেও বাংলাদেশের টাকার বিনিময় হার প্রায় স্থিতিশীল ছিল।
একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত, চীনের ইউয়ান ও পাকিস্তানের রুপি ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশের টাকার ক্ষেত্রেও সামান্য শক্তিশালী হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘এক্সচেঞ্জ রেট অ্যান্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট ডায়নামিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১১টি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের এক বছরের বিনিময় হার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাটিস্টিকসের (আইএফএস) তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার ওনের মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। ভারতীয় ও শ্রীলংকান রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ করে। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহর দর কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মূল্য প্রায় ৪ শতাংশ করে বেড়েছে। পাকিস্তানের রুপি শক্তিশালী হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। বাংলাদেশের টাকার ক্ষেত্রেও ডলারের বিপরীতে সামান্য শক্তিশালী হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১ জুন আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৯৬ পয়সা। এক বছর পর, ২০২৬ সালের ১ জুন তা কমে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল না হয়ে প্রায় ২১ পয়সা শক্তিশালী হয়েছে।
এই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও কম্বোডিয়ার মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গত এক বছরে ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলেও বাংলাদেশে এমনটি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানান তিনি। তিনি জানান, গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে কোনো ডলার বিক্রি করেনি; বরং বাজার থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। একই সময়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হয়েছে।
টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার পেছনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড সাড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। চলতি অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। ফলে বর্তমানে বাজারে ডলারের বিনিময় হারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ নেই বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও টাকার স্থিতিশীলতার পেছনে রেমিট্যান্সকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রার ওঠানামার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতিও জড়িত।
বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কার্যক্রমে স্থবিরতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, জ্বালানি সংকট কাটিয়ে বেসরকারি খাত সক্রিয় হলে আমদানির চাহিদা বাড়তে পারে। তখন বর্তমান বিনিময় হার কতটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালের পরবর্তী তিন বছরে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই সময়ে টাকার বিনিময় হার ৪৫ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে এবং মূল্যস্ফীতিও দুই অঙ্কের ঘরে উঠে যায়।
পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটও বিনিময় হার থেকে পাওয়া স্থিতিশীলতার সুফল কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক চিত্রে দেখা যায়, ভারতীয় রুপির দর এক বছরে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ভারতীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজার থেকে অর্থ প্রত্যাহার এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশটিতে ডলারের চাহিদা বেড়েছে।
শ্রীলংকান রুপিও একই সময়ে প্রায় ১০ শতাংশ দুর্বল হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহর অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের মুদ্রার দর কমেছে প্রায় ১ শতাংশ। সিঙ্গাপুর ও কম্বোডিয়ার মুদ্রায় তুলনামূলকভাবে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিজ রেটিংস বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ঋণমানের পূর্বাভাসে এ ধরনের পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে ভবিষ্যতেও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে তা সহায়ক হতে পারে।