এখন থেকে কোনো শেয়ারধারী কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা পরিচালক ছাড়া অন্য কেউ ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যাংকের প্রতিনিধি বা মনোনীত পরিচালক হতে পারবেন না। অর্থাৎ, কোনো শেয়ারধারী কোম্পানির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদে মনোনীত পরিচালক হতে হলে ওই ব্যক্তিকে অবশ্যই শেয়ারধারী কোম্পানিটির এমডি বা পরিচালক হতে হবে।
ব্যাংকের পর্ষদে শেয়ারধারী কোম্পানির মনোনীত পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার এ–সংক্রান্ত আদেশ জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকের শেয়ারধারণ–সংক্রান্ত আরও কয়েকটি নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধানে কোনো কোম্পানি এক বা একাধিক ব্যাংকের যত খুশি শেয়ার কিনতে বা ধারণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে কোনো কোম্পানি তার প্রকৃত সম্পদমূল্যের (নেট অ্যাসেট ভ্যালু) বেশি মূল্যমানের ব্যাংকের শেয়ার কিনতে বা ধারণ করতে পারবে না।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, তাহলে ওই কোম্পানি দেশের এক বা একাধিক ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা মূল্যমানের শেয়ার ধারণ বা কিনতে পারবে। একাধিক ব্যাংকে শেয়ার থাকলেও সেগুলোর সম্মিলিত মূল্যমান ১০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারবে না।
ইতিমধ্যে কোনো কোম্পানি নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যাংকের শেয়ার ধারণ করলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। যেমন, ১০০ কোটি টাকা প্রকৃত সম্পদমূল্যের কোনো কোম্পানির হাতে যদি এক বা একাধিক ব্যাংকের ১৫০ কোটি টাকা মূল্যমানের শেয়ার থাকে, তাহলে ছয় মাসের মধ্যে ৫০ কোটি টাকা সমমূল্যের শেয়ার বিক্রি বা অন্য কোনো উপায়ে কমাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক-কোম্পানির মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এসব নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মনোনীত পরিচালকদের ভূমিকা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘অনেক কোম্পানি একাধিক ব্যাংকের শেয়ার ধারণ করে মনোনীত পরিচালক দিয়ে একাধিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর ওপর একক কোম্পানির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আমাদের এই সিদ্ধান্ত।’
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ব্যাংকের শেয়ার কিনে ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে মনোনীত পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মাধ্যমে শেয়ারধারী কোম্পানি ব্যাংকের পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নামে-বেনামে ইসলামী ব্যাংকসহ সাতটি ব্যাংকের শেয়ার কিনে এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। কাগুজে কোম্পানির নামে শেয়ার কিনে এসব ব্যাংকের পর্ষদে এস আলমের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পেশাজীবীকে মনোনীত পরিচালক হিসেবে বসানো হয়েছিল। পরে এসব মনোনীত পরিচালকের মাধ্যমে এস আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে একের পর এক ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে এসব ঋণের বড় একটি অংশ খেলাপি হলেও মনোনীত পরিচালকেরা এর দায়দায়িত্ব নিচ্ছেন না বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক হতে হলে ওই কোম্পানির ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো কোম্পানির পক্ষ থেকে মনোনীত পরিচালকের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন বিধানে এখন কোনো কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যাংকের মনোনীত পরিচালক হতে হলে ওই ব্যক্তিকে শেয়ারধারী কোম্পানিটির এমডি বা পরিচালক হতে হবে।
তবে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এসব ব্যাংকের বেশির ভাগ শেয়ার মুনাফা না করা প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টের হাতে রয়েছে। ব্যাংকগুলো অনুমোদনের সময় থেকেই এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন বিধান কার্যকর হবে না।