দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের পথে দীর্ঘদিনের বাধা। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তার রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা যেমন ক্ষুণ্ন করছে, তেমনি বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক ব্যয় ও অনিশ্চয়তা। এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমনে কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে পেশাদার হিসাববিদদের ভূমিকা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ: পেশাদার হিসাববিদদের ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণায় দুর্নীতির কাঠামোগত কারণ, এর অর্থনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে হিসাববিদদের ভূমিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছিলাম। গবেষণায় বলা হয়েছে, দুর্নীতি শুধু ব্যক্তির নৈতিক দুর্বলতার ফল নয়; বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত স্বাধীনতা এবং দুর্বল জবাবদিহির সমন্বয়ে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
দুর্নীতি বিষয়ে গবেষক রবার্ট ক্লিটগার্ডের বহুল আলোচিত একটি সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সূত্রটির মূল বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে যখন একচেটিয়া ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপক স্বাধীনতা থাকে, অথচ সেই ক্ষমতার যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় না, তখন দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। বিপরীতে শক্তিশালী জবাবদিহি ও নজরদারি দুর্নীতির পরিসর সংকুচিত করতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় আন্তর্জাতিক দুর্নীতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিম্ন অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পারিবারিক জরিপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, পাসপোর্ট সেবা ও পরিবহনের মতো জনসেবামূলক খাতে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু ঘুষের অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনিয়মের কারণে সরকারি সম্পদের অপচয়, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দুর্নীতি দমন কমিশন। গবেষণায় কমিশনের দুর্নীতি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি জনশুনানি এবং তরুণদের মধ্যে সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তরুণদের সততার চর্চায় উৎসাহিত করার জন্য পরিচালিত ‘সততা ভান্ডার’ ধরনের উদ্যোগকে দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পেশাজীবীদেরও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে হিসাববিদ ও নিরীক্ষকদের কাজের মধ্যেই আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে হিসাববিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আর্থিক প্রতিবেদন নির্ভুল ও স্বচ্ছ হলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মালিকপক্ষ, বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হয়।
অন্যদিকে হিসাব ব্যবস্থায় কারসাজি, লেনদেন গোপন কিংবা আর্থিক প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকলে অনিয়ম ও প্রতারণা আড়াল করা সহজ হয়ে যায়। তাই শক্তিশালী হিসাব ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ নিরীক্ষা দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত করার পাশাপাশি এগুলো সংঘটনের প্রবণতাও কমাতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পেশাগত সততা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন হিসাববিদ বা নিরীক্ষকের কাজ শুধু সংখ্যার হিসাব মেলানো নয়; বরং আর্থিক তথ্যের যথার্থতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাও তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ধরা পড়লে তা যথাযথভাবে চিহ্নিত ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে পেশাগত স্বাধীনতা ও নৈতিক দৃঢ়তা প্রয়োজন।
গবেষণায় এ কারণে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সততা, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একজন দক্ষ হিসাববিদ যদি প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অনিয়মকে উপেক্ষা করেন, তাহলে হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে হিসাববিদদের ভূমিকা তাই শুধু অনিয়ম শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ, কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নিরীক্ষার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ আগেই সীমিত করা সম্ভব। অর্থাৎ শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। হিসাববিদ ও নিরীক্ষকরা যাতে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব ছাড়াই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
দুর্নীতি দমনে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য তাই আইন প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, নৈতিক শিক্ষা এবং আর্থিক স্বচ্ছতাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। শুধু শাস্তি দিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়; দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হওয়ার পথগুলোও বন্ধ করতে হবে।