রাষ্ট্রের বাজেট তৈরির সময় খেটে খাওয়া মানুষের মতামত কতটা বিবেচনা করা হয়? প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রদর্শনেরও প্রশ্ন।
তাত্ত্বিকভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাজেট জনগণের জন্যই প্রস্তাবিত ও তৈরি হওয়ার কথা। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষক, পেশাজীবী, সকল শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করার কথা। বাস্তবে অবশ্য অধিকাংশ দেশে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে ফলে; খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ অনেক সময় সীমিত থাকে।
এখানেই একটি রাজনৈতিক মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, যারা ট্যাক্স দেয়, শ্রম দেয়, উৎপাদন করে এবং রাষ্ট্রকে সচল রাখে, তারা কি বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব পায়?
গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন নয়; রাষ্ট্রীয় সম্পদ কীভাবে ব্যয় হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুর্নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার নৈতিক চুক্তির লঙ্ঘন। যখন জনকল্যাণের অর্থ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় বা ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রাধান্য পায়, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না, তখন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না, রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ম্যক্স ওয়েবার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বৈধতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে জাঁ-জাক রুশো যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা জনগণের সাধারণ ইচ্ছা থেকে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল আয় ব্যয়ের হিসাব নয়; বাজেট রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকার গুলোরও প্রতিফলন।
যদি বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়, আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হয়, তবে সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয় এটি প্রতিনিধিত্ব, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার সংকটও বটে।
তাই একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দাবি হতে পারে “যে জনগণ রাষ্ট্রের অর্থের উৎস, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সিদ্ধান্তেও তাদের কণ্ঠস্বর থাকতে হবে; এবং যে রাষ্ট্র জনগণের নামে কর আদায় করে, তাকে জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে।”
লেখক: মুহাম্মাদ আজগর হোসেন জিহাদ (রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনৈতিক)