আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে মনোনয়নপত্র জমার আগে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ বা পরিশোধ করে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বড় খেলাপিরা মনোনয়নপত্র জমার আগের দিন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ বা তফসিলিকরণের সুযোগ পাচ্ছেন।
অথচ ক্ষুদ্র খেলাপি ও বিল খেলাপিদের ৭ দিন আগেই বিল বা ঋণ পরিশোধের বিধান রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে (আরপিও)।
এই বৈষম্য দূর করতে এবং প্রার্থীদের সমান সুযোগ দিতে খেলাপি ঋণের বিষয়ে চলমান বিধান সংস্কার করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এজন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে আগামী ৬ জুন বৈঠক ডেকেছে ইসি। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হবে। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আরপিও সংশোধনের জন্য ইসির পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানো হবে আইন মন্ত্রণালয়ে।
বিশেষ করে সব ধরনের খেলাপিরা যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হতে সমান সুযোগ পায় সেই প্রস্তাব ইসির পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। এর আগে বিশিষ্টজনের মতামত নিতে আগামী ৬ জুন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক হবে ইসিতে। বৈঠকে ঋণ ও বিল খেলাপিদের বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিতে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ডেকেছে কমিশন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আরপিও বিধান অনুযায়ী খেলাপিতে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু নির্বাচনের আগে ঋণ পরিশোধ করে প্রার্থী হওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাবে।
একাদশ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার আগের দিন বড় খেলাপিরা ঋণ পরিশোধ করে প্রার্থী হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্ষুদ্র এবং বিল খেলাপিদের পরিশোধের জন্য মনোনয়নপত্র জমার ৭ দিন আগ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে খেলাপিদের ঋণ পরিশোধে বৈষম্য দেখা দেয়। বর্তমান কমিশন এই বৈষম্য দূর করতে সংস্কার আনতে চায়।
এ বিষয়ে ইসির আইন সংস্কার কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, প্রার্থীদের ঋণ খেলাপিরে বিষয়ে কমিশন সংস্কার আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ৬ জুন এ বিষয়ে সবার পরামর্শ নিতে বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই দিন খেলাপি ঋণের উপরই আলোচনা করা হবে।
ইসি বিদ্যমান ব্যবস্থার সামান্য পরিবর্তন আনতে চায়। বিদ্যমান যেটি আছে তা যথাযথ নয়। একটু পরিবর্তন দরকার। এজন্য যারা এগুলো নিয়ে কাজ করতে তাদের নিয়েই বৈঠকে বসা হবে। সবার মতামত নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের কমিশনও এ বিষয়ে সংস্কার আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে নির্বাচনে সব খেলাপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমার আগের দিন ঋণ পরিশোধের বিধান রেখে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু এটা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কে এম নুরুল হুদা কমিশন বিদায় গ্রহণ করেছে। জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি চূড়ান্ত না করে নবনিযুক্ত কমিশনের কাছে ফেরত পাঠিয়েছে পর্যালোচনার জন্য। এজন্য কমিশন সবার মতামত নিয়ে প্রস্তাবনা তৈরি উদ্যোগ নিয়েছে।
এই বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যারা আছেন এ বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী কোটি টাকার ঋণ নিয়েও অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার পাঁচ হাজার টাকার জন্য অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের বৈষম্য দূর করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানির পরিচালক বা ফার্মের অংশীদারের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংক থেকে নেয়া বড় ধরনের ঋণ বা তার কিস্তি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগের দিন পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। কৃষি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণ এবং ব্যক্তিগত (টেলিফোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বা সরকারের সেবা দেয়া কোনো সংস্থার) বিলের ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সাত দিন আগে পরিশোধের বিধান রয়েছে।
তাই বড় ধরনের ঋণ এবং ক্ষুদ্র ঋণ ও বিল পরিশোধের জন্য অভিন্ন সময়সীমা রাখার জন্য আরপিওতে প্রস্তাব করেছিল বিগত কমিশন। সেটিকে কীভাবে আরও ভালোভাবে করা যায় সেই চিন্তাভাবনা করছে ইসি। সাবেক নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বসছে ইসি: এদিকে চলামান সংলাপের অংশ হিসেবে ইসিতে প্রধান ও অন্য কমিশনারদের সঙ্গে বসতে চায় নির্বাচন কমিশন।
এজন্য আগামী ১২ জুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ৯ জুন নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শে বসছে ইসি। ইসির যুগ্মসচিব এস এম আসাদুজ্জামান জানান ইসিতে নিবন্ধিত ১১৮টি নির্বাচন পর্যাবেক্ষক সংস্থার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫টি সংস্থাকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে।
বর্তমান ইসি দায়িত্ব নিয়েই নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরিতে সংলাপ শুরু করেছে। ১৩ ও ২২ মার্চ এবং ৬ ও ১৮ এপ্রিল দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপ করেছে ইসি।
এতে দলীয় প্রভাবমুক্ত অংশগ্রহণমূল নির্বাচন, সুষ্ঠু ভোটের নিরাপত্তা, ইভিএম ব্যবহারে আরো সময় নেয়া, বিভাগভিত্তিক একাধিক দিনে ভোটের আয়োজন, নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ ইত্যাদি সুপারিশ আসে। কমিশন সেসব আমলে নিয়ে ইতোমধ্যে বিচার বিশ্লেষণ করে নিজেদের অবস্থানও জানিয়েছে।