বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর সরকারি বন্ডবাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয় বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সরকার থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের ওপর।
গত দুই সপ্তাহে প্রধান অর্থনীতিগুলোর বন্ডবাজারে অস্থিরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ বা ইয়িল্ড শুক্রবার ৪ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে, যা ১০ দিন আগেও ছিল ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইয়িল্ড ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়েও পৌঁছায়।
বন্ডবাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থব্যবস্থার দিকে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে নজর দেওয়াকে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি দীর্ঘ সময় ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে বিশাল ঋণ ও ঘাটতির বিষয়টি বাজারে তেমন বড় উদ্বেগ তৈরি করেনি। তবে এখন বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক চাপকে আগের তুলনায় বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—সরকারি ঋণের চাপ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবের ধারণা। বাজার যখন কোনো দেশের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন কখন সেই পরিবর্তন বড় আকার নেবে তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।
এদিকে সরকারি ঋণের পাশাপাশি বৈশ্বিক বন্ডবাজারে অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে পরিবহন, উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের খরচ বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর পথে যেতে হতে পারে।
সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হলে সরকারি বন্ডের ইয়িল্ডও সাধারণত বাড়ে। ফলে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করাও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্যেও সরকারি বন্ডের ইয়িল্ড বৃদ্ধির ফলে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারি ব্যয়ের প্রতি ১২ পাউন্ডের মধ্যে প্রায় ১ পাউন্ড ইতোমধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়।
বন্ডের ইয়িল্ড আরও বাড়লে যুক্তরাজ্যের ট্রেজারির সুদ ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর ফলে সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় কর বৃদ্ধি অথবা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
জাপানেও দীর্ঘদিনের প্রায় শূন্য সুদের হার ও মূল্যহ্রাসের যুগ থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে দেশটির সরকারি ঋণবাজারেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চাপ বাড়ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি বন্ডের ইয়িল্ডও ১৫ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। একই সময়ে দেশটির সরকারি ঋণ ১ ট্রিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও সুদের হার বাড়লে সরকারের ব্যয়ের চাপ যে বাড়বে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগ। এর সঙ্গে দেশটির আবাসন বাজারে মূল্য কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে অসন্তোষের পরিবেশও তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশাও বাজারে জোরালো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের বৈশ্বিক পরিবেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে, এসব দেশের অনেকগুলোই এখন স্বল্পমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভরশীল। বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এ ধরনের বিনিয়োগ দ্রুত প্রত্যাহার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বন্ড পুনঃঅর্থায়নের সময় সুদের হার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে গেলেও অনেক দেশের সরকারি বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে জলবায়ু মোকাবিলা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোর মতো খাতে ব্যয় কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়াও, সরকারি বন্ডের ইয়িল্ড বাড়লে তার প্রভাব ধীরে ধীরে করপোরেট ঋণবাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। কোম্পানিগুলোর নতুন বিনিয়োগের অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে যায় এবং ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য মুনাফা কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিপুল ঋণ তুলছে। চলতি বছর পাঁচটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ঋণ ইস্যুর পরিমাণ প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড় ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে বৈশ্বিক সুদের হার বাড়তে থাকলে এসব ঋণের খরচও বাড়বে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারি বন্ড ও করপোরেট ঋণের মধ্যে অর্থ বণ্টন নিয়েও নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে।
বন্ডবাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের ওপর। সরকারি বন্ডের ইয়িল্ড বাড়লে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের অর্থায়ন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আবাসন ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বন্ধকি ঋণের সুদ বাড়তে শুরু করেছে। সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে বাড়ি কেনার সক্ষমতা কমতে পারে এবং আবাসন বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করতে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। করপোরেট খাতের আর্থিক অবস্থান আগের তুলনায় তুলনামূলক শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে উচ্চ সুদের পরিবেশে বিপুল ঋণনির্ভর কিছু বেসরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প ও প্রাইভেট ইকুইটি খাত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ এখনই বড় ধরনের আর্থিক সংকটের পূর্বাভাস না থাকলেও ঝুঁকির কিছু জায়গা তৈরি হয়েছে।
সপ্তাহের শেষদিকে বৈশ্বিক বন্ডবাজারের বিক্রির চাপ কিছুটা কমেছে। তবে কয়েক মাস আগের তুলনায় ইয়িল্ড এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—সরকারি ঋণ যত বাড়বে, সুদের হারের সামান্য পরিবর্তনও রাষ্ট্রের বাজেটে বড় প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানির দাম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার মতো বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ফলে আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য শুধু সুদের হার কত হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং বড় অর্থনীতিগুলো কীভাবে তাদের ক্রমবর্ধমান ঋণ ও বাজেট ঘাটতি সামাল দেবে, সেটিই বন্ডবাজারের স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।