রাষ্ট্র নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে বড় সংকট হলো আমরা এখনও রাষ্ট্রকে জনগণের যৌথ মালিকানা হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করি। ফলে রাষ্ট্রের ধারণা ক্রমশ নাগরিকের হাত থেকে দূরে সরে গিয়ে আমলাতন্ত্র, দলীয় আধিপত্য এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় বন্দী হয়ে পড়েছে!
কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাস কিন্ত অন্য কথা বলে।
আধুনিক রাষ্ট্র কোনো রাজা, সামরিক শক্তি বা রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি নয়। এটি জনগণের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল। হবস রাষ্ট্রকে দিয়েছেন শৃঙ্খলার ভিত্তি, লক দিয়েছেন নাগরিক অধিকার, রুশো দিয়েছেন গণসার্বভৌমত্ব, হেগেল দিয়েছেন নৈতিক রাষ্ট্রের ধারণা, মার্কস দিয়েছেন ক্ষমতা ও শ্রেণির সমালোচনা, ওয়েবার দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার ব্যাখ্যা, আর ফুকো দেখিয়েছেন ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রশ্ন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র আসলে কার? আমার উত্তর স্পষ্ট। রাষ্ট্র জনগণের। রাষ্ট্র কোনো রাজধানীর মালিকানা নয়। রাষ্ট্র কোনো শাসক দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র কোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর নামও নয়। রাষ্ট্র হলো জনগণের সম্মিলিত রাজনৈতিক সত্তা, যেখানে সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত উৎস জনগণ নিজেই।
এই কারণে আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার অর্থ ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং ক্ষমতাকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।
যেখানে সব সিদ্ধান্ত রাজধানীতে নেওয়া হয়, সেখানে রাষ্ট্র বড় হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্র বড় হয় না। যেখানে স্থানীয় জনগণ নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে অংশ নিতে পারে না, সেখানে রাষ্ট্র টিকে থাকলেও নাগরিকত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যেখানে নাগরিকত্ব দুর্বল, সেখানে রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে যায়। সুতরাং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীকরণে নয়, বিকেন্দ্রীকরণে।
আমি এমন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করি যেখানে জাতীয় ঐক্য থাকবে, কিন্তু সাথে স্থানীয় ক্ষমতায়নও থাকবে; কেন্দ্রীয় সরকার থাকবে, কিন্তু সেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণও থাকবে; জাতীয় পরিচয় থাকবে, কিন্তু আঞ্চলিক মর্যাদাও নিশ্চিতভাবে থাকবে। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি রাজধানীর সীমানা নয়, রাষ্ট্রের শক্তি জনগণের অংশগ্রহণের মধ্যে নিহিত থাকে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; যেসব রাষ্ট্র জনগণকে প্রজা বানাতে চেয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত সংকটেই পড়েছে। আর যেসব রাষ্ট্র জনগণকে অংশীদার বানিয়েছে, তারাই স্থিতিশীলতা ও উন্নতির পথে এগিয়েছে। আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো আমরা কি রাষ্ট্রকে শাসনের যন্ত্র হিসেবে দেখব, নাকি জনগণের যৌথ রাজনৈতিক মালিকানা হিসেবে দেখব?
যদি রাষ্ট্রকে জনগণের যৌথ মালিকানা হিসেবে দেখতে শিখি, তবে রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম; ক্ষমতা থাকতে হবে জবাবদিহির অধীন; উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক; এবং গণতন্ত্র হবে শুধুই নির্বাচন নয়, বরং জনগণের দৈনন্দিন রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া।
রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোনো একক নেতা নির্ধারণ করে না, কোনো একক দলও নির্ধারণ করে না। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে সচেতন নাগরিকসমাজ। এই কারণেই আমি বলি রাষ্ট্রের মালিক সরকার নয়। রাষ্ট্রের মালিক আমলাতন্ত্র নয়। রাষ্ট্রের মালিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়। রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ মালিক জনগণ।
আর জনগণের সেই মালিকানাকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার নামই গণতন্ত্র; আর সেই গণতন্ত্রকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে পৌঁছে দেয়ার নামই বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রচিন্তা।