
বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে (আইবিবিএল) ঋণ বিতরণের কোনো নীয়মনীতি মানা হচ্ছে না অভিযোগ উঠেছে। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে দিচ্ছে ব্যাংকটি। বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে রাখা হচ্ছে না পর্যাপ্ত জামানত। এমন তথ্য ফাঁস হতে থাকায় আতঙ্ক বাড়ছে ব্যাংকটির আমানতকারীদের মধ্যে। এদের কেউ কেউ ব্যাংকটি থেকে তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন। এতে ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ কমছে। শুধু গত নভেম্বর মাসে ব্যাংকটিতে আমানত কমেছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকে মনিটরিং বাড়ানোয় বেপরোয়া ঋণে কিছুটা লাগাম পড়বে বলে আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। আর এখনো ব্যাংকটিতে দেড় লাখ কোটি টাকা আমানত থাকায় আতঙ্কের কিছু নেই বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, আর যাতে কোনো বেনামী ঋণ বিতরণ না হয় সেটি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিতরণকৃত ঋণের অর্থ উদ্ধারে মনোযোগ দিলে ব্যাংকটি তার আগের শক্তিশালী অবস্থান ফিরে পাবে।
তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে কিছু প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীকেন্দ্রিক ব্যবসা পরিচালনাকারী নাবিল গ্রুপের নতুন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। এ ক্ষেত্রে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ অর্থসূচককে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংকের উপর একটি পরিদর্শন চলছে। এসব বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামানত ছাড়া অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ায় এখন ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকটির আমানত। আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা টাকা তুলে নিতে শুরু করেছেন।
চলতি অর্থবছরের ৩০ নভেম্বর এসে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। গত ৩১ অক্টোবর শেষেও ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিলো ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যাবধানে ব্যাংকটির আমানত কমেছে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও আমানত কমার বিষয়ে জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মুহাম্মদ মুনিরুল মওলাকে মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এরপরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত মাত্র এক মাসে (১৬ অক্টোবর- ১৭ নভেম্বর) নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৩ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এছাড়া গত ছয় মাসে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিমুল এন্টারপ্রাইজ, গ্রেইন ক্রপস, নাবা ফার্ম ও নাবা এগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ৪ হাজার ৪৩৫ কোটির ঋণ দেওয়া হয়। একই সময় রাজশাহীভিত্তিক মার্টস বিজনেস লিমিটেডকে ৯০০ কোটি, আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রডাক্ট প্যালেস নামের প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ কোটি ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। ঋণ বিতরণ করা অধীকাংশ প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন বলে জানা গেছে। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে ঋণের বিষয়ে জানা যায়, ইন্টারন্যাশনাল প্রডাক্ট প্যালেসের ঋণগ্রহীতার বর্তমান ঠিকানায় বড়গাছী, পবা, রাজশাহী ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গরমিল রয়েছে পোস্ট কোডে। আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
আনোয়ারা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যিনি ঋণ গ্রহণ করেছেন, তার নাম হচ্ছে মোখলেসুর রহমান। ঠিকানায় দেওয়া হয়েছে রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর উপজেলার পারিলা গ্রাম। অথচ দুর্গাপুর উপজেলায় পারিলা নামে কোনো গ্রামই নেই। পারিলা মূলত রাজশাহীর পাবা উপজেলার একটি ইউনিয়ন। ওই ব্যক্তির পোস্ট অফিস দেখানো হয়েছে দাওকান্দি আর পোস্ট কোড ৬২৪০। যে পোস্ট কোডটি রাজশাহীর দুর্গাপুরের পোস্ট কোড। এছাড়া অস্তিত্বহীন আরেক প্রতিষ্ঠান মার্টস বিজনেস লিমিটেডকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক।
চলতি বছর ১ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে আট ধাপে প্রতিষ্ঠানটিকে এ ঋণ দেওয়া হয়েছে। এদিকে চলতি বছর ৬ জুলাই থেকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের রাজধানীর গুলশান-২ শাখা নাবিল গ্রেইন ক্রপস নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় ধাপে ৯৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ দেয়। ব্যাংকের বিভিন্ন চার্জসহ বর্তমানে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এসব ঋণের অধিকাংশই বিতরণ করা হয়েছে গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved