
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের যে কোনো দেশের উন্নতির পেছনে যে খাতটি অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকা পালন করে সেটি হলো ব্যবসায়। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন কিংবা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি- সবকিছুতেই রয়েছে ব্যবসায়ের অবদান। তাই এ খাতটিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন আরো বেশি গবেষণা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় বর্তমানে এখানকার ব্যবসায়িক পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বিকশিত হয়েছে যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি বেড়েছে বিদেশি বিনিয়োগও। আর এগুলো আমাদের এ বার্তাই দেয় আগামীতে এ অগ্রগতিকে আরো ত্বরান্বিত করতে হলে এ খাতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।
এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজন্যাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের বলেন, "ব্যবসায়ের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন। কারণ একই পণ্য সবসময় সবার
কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তাই ক্রেতাভেদে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কাজে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।"
তিনি আরো বলেন, "বর্তমানে অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট নামে একটি বিভাগ আছে যেটির কাজ হলো পণ্যকে কিভাবে ক্রেতাদের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় সেটি নিয়ে গবেষণা করা। এটি প্রমাণ করে আমাদের দেশে এখন গবেষণার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
পোশাক শিল্প কিংবা ঔষধ শিল্পের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতে গবেষণা কীভাবে সাহায্য করতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বর্তমানে আমাদের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প হচ্ছে পোশাক শিল্প। আমি মনে করি কিভাবে এ শিল্পের ক্রেতার সংখ্যা আরো বাড়ানো যায় সে বিষয়ে এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আরো বেশি গবেষণা করা প্রয়োজন। একইভাবে ঔষধ শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের পরিধি বাড়াতেও গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।"
তবে ব্যবসায়িক খাতে গবেষণার সুযোগ থাকলেও এ গবেষণা কার্য পরিচালনা করতে বেশকিছু সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে গবেষণার সুযোগ অনেক সীমিত। তাছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ে যতটা গবেষণা হয়, ব্যবসায়ে ততটা গবেষণা দেখা যায় না।
ব্যবসায়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একজন গবেষককে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আফতাব উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে ব্যবসায় খাতে গবেষণায় সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো অংশীজনদের মাঝে সঠিক মূল্যায়নের অভাব। অন্যান্য দেশে গবেষণাকে যতটা গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে এটিকে ততটা গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় না। এছাড়া রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রেষণা বাংলাদেশে এখনো অনেকটাই অপর্যাপ্ত। তাই অনেক গবেষক গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।"
এছাড়া তিনি গুরুত্বারোপ করেন তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক সুযোগ বাড়ানোর উপরও। তিনি বলেন, "ভালো পাবলিকেশনের জন্য ভালো পাবলিশার্সদের ডাটাবেইসে এক্সেস থাকাটা খুবই জরুরি যা আমাদের দেশে অনেক সীমিত। কারণ একজন গবেষককে তার গবেষণা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে এসব ডাটাবেইসে প্রায়ই প্রবেশ করতে হয়। আর যখন এ কাজে তাকে বাধাপ্রাপ্ত হতে হয় তখন সেটি তার কাজে সমস্যা সৃষ্টি করে।"
বাংলাদেশে গবেষণায় ফান্ডিং এর সুযোগ কেমন এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, "গবেষণা কার্য সুচারুরূপে করতে ফান্ডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশে অনেকক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত পরিমাণ ফান্ডিং পাওয়া যায় না যেটি কাজের অগ্রগতি কমিয়ে দেয়।"
তবে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা এবং সমন্বয়। তাই এসব সমস্যার সমাধানে যথাযথ ব্যক্তিবর্গকে অবশ্যই পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
এসব বিষয়ে আরো জানতে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজন্যাস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: এনামুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, "বাংলাদেশে ব্যবসায়িক খাতে গবেষণায় যেসব সমস্যাগুলো আছে সেগুলো সমাধানের জন্য প্রথমেই কাজ করতে হবে ফান্ডিং সমস্যা নিয়ে। আর এক্ষেত্রে সরকারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন উন্নত দেশে গবেষণা খাতে ব্যয়ের পরিমাণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আমেরিকা, চায়না, এবং জাপানে এ ব্যয়ের পরিমাণ তাদের মোট জিডিপির যথাক্রমে ৩.১%, ২.২%, এবং ৩.২%। এছাড়া আমাদের পাশের দেশ ভারতে এ ব্যয় তাদের মোট জিডিপির ১.৩%। কিন্তু আমাদের দেশে এ হার খুবই কম। তাই এ বিষয়ে অবশ্যই সরকারকে আরো সচেতন হওয়া উচিত। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্যমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে ব্যয়ের পরিমাণ মোট ব্যয়ের মাত্র ২% যা খুবই নগণ্য। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এ বিষয়টির উন্নয়নে কাজ করা উচিত। এছাড়া উন্নত দেশগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফান্ডিং দিতে দেখা যায় যা আমাদের দেশে খুব একটা হয় না। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসা দরকার।"
এছাড়া তার মতে মানুষের মাঝে গবেষণার মনোভাব তৈরি করাটাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, "আব্রাহাম মাসলো যেমন তার চাহিদা সোপান তত্ত্বে মানুষ একটি পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার পর এর পরবর্তী পর্যায়ে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যেতে চাওয়ার কথা বলেছিলেন, তেমনিভাবে গবেষণার ক্ষেত্রেও গবেষণা কার্যকে পরবর্তী সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মনোভাব তৈরি করা দরকার। এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে গবেষণা নির্ভর করা এবং মানুষের মাঝে এরূপ একটি সংস্কৃতি তৈরি করাটাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।"
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গবেষকদের জন্য কি ধরনের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে অনেকগুলো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত গবেষণার পরিবেশ তৈরি, ফান্ডিং পেতে সহযোগিতা করা, গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, গবেষণাধর্মী জার্নাল ও ডাটাবেইসে প্রবেশের এক্সেস প্রদান করা ইত্যাদি। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে এগুলো গবেষণার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।"
বর্তমানে ব্যবসায় খাতে গবেষণার উপর ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এ খাতে গবেষণায় যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো সমাধান করা জরুরি। তাহলে আশা করা যায় আগামীতে ব্যবসায় খাত আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবে যা দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রাখবে।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved