
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার যেসব পদক্ষেপগুলো হাতে নিয়েছে তার মধ্যে রিফাইন্যান্স স্কিম অন্যতম। কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষ যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ভর্তুকি সুবিধা লাভ করে সেটিকেই মূলত রিফাইন্যান্স স্কিম বলা হয়ে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এই কাজটি করে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত আমানতের উপর সুদের হার ৬% এবং ঋণের উপর সুদের হার ৯%। এর মানে হল বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত কোনো ব্যাংক যদি তার গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আমানত হিসেবে নেয়, তাহলে এর বিনিময়ে ব্যাংক তার গ্রাহককে মাসিক ৬% হারে সুদ প্রদান করবে। আর গ্রাহক পর্যায়ে সংগৃহীত আমানত যখন ব্যাংক কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিবে তখন উক্ত ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থাকে ব্যাংক প্রতি মাসে সুদ নিবে ৯% হারে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩% সুদ হচ্ছে ব্যাংকের আয়। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখা যায় ৯% মাসিক সুদের হারে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারেন না যেহেতু সুদের হার অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। তাই এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এক ধরনের বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করে যার আওতায় কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অপেক্ষাকৃত কম সুদে ব্যাংক ঋণ পেয়ে থাকে যা রিফাইন্যান্স স্কিম নামে পরিচিত।
রিফাইন্যান্স স্কিমের ক্ষেত্রে শতকরা ৪-৭/৮ সুদের হারে ঋণ সুবিধা পাওয়া যায় এবং বাকী সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রদান করে। এর ফলে দেশে বৃহদায়তন ব্যবসায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আয়তনের বিভিন্ন ব্যবসায় ও শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠে। আবার অন্যদিকে রিফাইন্যান্স স্কিমের ক্ষেত্রে কৃষিকাজের জন্য ভর্তুকি সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ফলে দরিদ্র্য কৃষকরাও ব্যাংক ঋণের সুবিধা গ্রহণ করতে পারায় এটি দেশের কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
রিফাইন্যান্স স্কিমের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা মোরশেদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “বিগত বেশ কিছু বছর যাবত রিফাইন্যান্স স্কিমের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় কৃষি খাত। আবার এসব ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার সময় জামানত এবং জামিনদার ঠিক করা নিয়েও খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় না। ফলশ্রুতিতে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা পাওয়ায় উদ্যোক্তা কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সহজেই তাদের ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে যা দেশের সামগ্রীক উন্নয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।“
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশের প্রত্যেকটি খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো একটি অপরিহার্য বিষয়। কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতে পিছিয়ে থাকা মানে হল ঐ খাতে অধিক মাত্রায় আমদানি নির্ভর হয়ে যাওয়া যা দুইটি দেশের মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি করে এবং এর ফলে মুদ্রার মান কমে যায়। অন্যদিকে রিফাইন্যান্স স্কিমের ক্ষেত্রে দেশের পিছিয়ে থাকা খাতগুলো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রাধান্য পায়। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক খাতগুলোতে সমতা বিরাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয় যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১-২০২২ অর্থবছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রিফাইন্যান্স স্কিমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল যার আওতায় প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক, স্বল্প আয়ের মানুষ, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ৭% সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পান। মহামারির কারণে বাংলাদেশে অনেকে চাকরি হারানোয় দারিদ্র্যের হারও কিছুটা বেড়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই এইসব মানুষদের উৎপাদন কার্যাবলী পরিচালনা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রেও অনেকসময় বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিতে দেখা যায়। বিশেষ করে করোনা মহামারি পরিস্থিতেতে সরকার বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছে যার মধ্যে অনেতম হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকিতে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করা। এর ফলে মহামারি পরিস্থিতিতে হঠাৎ থমকে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে।
রিফাইন্যান্স স্কিম যেহেতু মূলত পিছিয়ে থাকা খাতগুলোকে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য হাতে নেওয়া হয়, তাই এই স্কিমের আকার যত বাড়বে তা তত বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। যদিও বাংলাদেশে এই স্কিমের আকার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই আগামী দিনগুলোতে যদি এর আকার আরো বাড়ানো যায় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির উপর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে স্কিমের আকার বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক ব্যক্তিরা যাতে এই সুবিধা পেতে পারেন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া মাঝেমাঝে এসব ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে ঐসব অনিয়ম রোধ করে কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে সেটি সমগ্র দেশের জন্য আরো বেশি মঙ্গলজনক হবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved