
আপনারা ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন যে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিল UNHCR এর জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত জনাৰ ড. ইয়ান ফ্ৰাই (Dr. Ian Fry) বর্তমানে বাংলাদেশে সফররত রয়েছেন। বাংলাদেশে অবস্থান কালে ড. ইয়ান ফ্রাই দেশের জলবায়ু বিপদাপন্ন এলাকা ও জনগোষ্ঠী পরিদর্শন করবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে হঠাৎ ও ধীরলয়ের দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার কিভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেসব সরজমিনে প্রত্যক্ষ করবেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে লঙ্ঘিত মানবাধিকার সুরক্ষায় করণীয় বিষয়ে সুপারিশমালা পেশ করবেন। ইতোমধ্যে তিনি দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন কর্মীদের সাথে প্রাথমিক মতবিনিময় করেছেন। দেশের জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ উপদ্রুত দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলা ও হাওড় অঞ্চল তার সফর পরিকল্পনায় রয়েছে।
ড. ইয়েন ফ্রাই এর বাংলাদেশ সফর বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ, এক: জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের সরাসরি সমর্থন ছিলো। দুই জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্তির পর বাংলাদেশেই তিনি প্রথম দাপ্তরিক সফর করছেন। তিন: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নে বাংলাদেশের জলবায়ু ও বন্যা উপদ্রুত জনগোষ্ঠীর বিপদাপন্নতার চিত্র বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
মূলত, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত স্থানিক ও বহুমুখী। এর বিপদাপন্নতার মাত্রা (Degree of vulnerability) ভৌগলিক অবস্থান, জনগোষ্ঠী, এমনকি ব্যক্তিভেদে ভিন্নতর হতে পারে। একই ভৌগলিক অবস্থানে এবং সম্প্রদায়/সমাজে বসবাস করলেও ব্যক্তির সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সম্পদে অভিগম্যতা, জীবিকার ধরন ও বৈচিত্রতা ইত্যাদি কারণে বিপদাপন্নতার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্থান, সম্প্রদায় ও ব্যক্তি পর্যায়ে ভিন্ন ও বহুমূখী বিপদাপন্নতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে অতি সম্প্রতি সিপিআরডি তিনটি অঞ্চলিক সংগঠনের সহযোগিতায় (এস.ডি.এস. বাদবন সংঘ, মাসাউস) দেশের তিনটি জলবায়ু অভিঘাতপূর্ণ অঞ্চলে (Climate stressed areas) (দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল — বাগেরহাট জেলা, গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার (GMB) নিম্নাঞ্চল— শরীয়তপুর জেলা, এবং খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল – রাজশাহী জেলা) একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০২২ সালে পরিচালিত এই গবেষণায় একই জনগোষ্ঠীর বিপদাপন্নতার ভিন্নতা ও ক্ষেত্র বিশেষে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও উঠে এসছে।
এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন জনিত হঠাৎ ও ধীরলয়ের দুর্যোগের কারণে সম্পদ ও ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি জানা, দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে (long-term Impact) সৃষ্ট অর্থনৈতিক সামাজিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন বেকারত্ব ও দারিদ্রতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, সামাজিক অবক্ষয়, সম্পদহানি, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম বৃদ্ধি ইত্যাদি সবিস্তারে অনুসন্ধান করা এবং এর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মানবাধিকার ভোগ করতে না পারার বিষয়টি তুলেধরা। গবেষণার মাধ্যমে বাড়ি (৬০০ টি) পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত জনিত মানবাধিকার পানের ৩০ টি জীবন ঘনিষ্ট চিত্র গল্প আকারে তুলে ধরা হয় এবং স্থানীয় বিভিন্ন অংশীজন (সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি) এর স্বাক্ষাতকার গ্রহণ (KII) এবং প্রতিটি অঞ্চলে কমিউনিটি সংলাপ (FGD) করা হয়।
১৯১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে খরায় তাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে/হয়েছে, ৮৬.৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রা ব্যহত করছে, ৯৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন খাবার পানির সংকটে ভুগেন, ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন বৃষ্টিহীনতার ফলে তাদের জীবন প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা মানুসিক দুশ্চিন্তায় থাকেন, ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তাদের জীবনে আনন্দ-উৎসব কমে গেছে, ৩২ শতাংশ বলেছেন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দারিদ্রতায় বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন। কর্মক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে তাদের অঞ্চলে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে।
২০০ জন পশ্নপত্র উত্তরদাতার মধ্যে ১২৮ জন উত্তরদাতা বলেছেন তাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত ২০ বছরে গৃহপালিত পশু পাখি হারিয়েছেন এবং এই ১২৮ টি পরিবারে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির মোট পরিমান ৬৭,৫৩,৮০০.০০ টাকা (চলতি মূল্যে), যা গড়ে ৩৩.৭৬৯ টাকা ২০ বছরে ২০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ১৭৮ জন উত্তরদাতার বাড়ি-ঘর দুর্যোগে ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে এবং এর আর্থিক মূল্য ৭৯ ৮১,২০০.০০ টাকা এবং গড়ে ৩৯৯০৬ টাকা, ফসল হানি হয়েছে ৮১ টি পরিবারের এবং আর্থিক মূল্য ৪৯,২৩,৪০০.০০ টাকা, ৭৭ জনের শ্রমের কর্ম ঘন্টা কমেছে বা ৩৮.৫ শতাংশ মানুষের শ্রমঘন্টা কমে গেছে এবং এই ৭৭ জনের বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪,২৩,০০০.০০ টাকা, গড়ে ২.১১৫ টাকা, দুর্যোগে বিভিন্ন সময় কর্মহীন হয়েছেন ৯৭ (৪৮.৫%) জন মানুষ। ২২.৬৮ শতাংশ বলেছেন তারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগেন, ৪০.২১ শতাংশ বলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পেশা বদল করে তারা সংকটে পরেছেন, ২৬.৮০ শতাংশ উত্তরদাতা কর্মের অনিশ্চয়তায় ভোগছেন।
১৯৯.৫ শতাংশ বলেছেন তারা তাদের পরিবারে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগব্যাধি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৫৫.৭ শতাংশ গর্ভবর্তী এবং বয়স্ক নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩৯.৫ (%) শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন নারীদের বিভিন্ন স্ত্রীরোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, ৭৩.৫ (%) শতাংশ বলেছেন নারীদের চর্মরোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, ৫৬.৫% শতাংশ বলেছেন নারীদের প্রশবজনিত জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বপরী পর্যাপ্ত খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার, সুস্থ ভাবে বাঁচার অধিকার এবং কর্ম প্রাপ্তির অধিকার সবথেকে বেশি ভূগোষ্ঠিত হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার বিনষ্ট হওয়া এবং ভোগান্তি সব থেকে বেশি।
নদীভাঙ্গন প্রবন শরীয়তপুর অঞ্চলের নড়িয়া উপজেলা এবং জাজিরা উপজেলার মোট ৫ টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় এই গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনা করা হয়। প্রশ্নপত্র জরিপে অংশনেওয়া ৭৪% উত্তরদাতা মনে করেন গত বিশ বছরে তাদের অঞ্চলে ঋতুচক্রের পরিবর্তন হয়েছে, ৭৯.৫% উত্তরদাতা মনে করেন তাদের অঞ্চলে আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ৯২% বলেছেন জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এছাড়া অসময়ে বন্যা, ঘনকুয়াসা, বৃষ্টিহীনতার ফলে ফসল হানি গত এক দশকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭১% শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন নদী ভাঙ্গন এবং জলাবদ্ধতার কারণে শারীরিক ভাবে আহত হওয়ার এবং রোগ সংক্রমন হয়েছিলে, ৯২% শতাংশ উত্তরদাতা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষষিকচাপ, বিষণ্ণতা এবং অবসাদগ্রস্ততায় ভুগেন, ১০০ শতাংশ উত্তরদাতা ডায়রিয়া, চর্মরোগ, সর্দ-জ্বরের মতন রোগে ভুগেন, ৮৩% বলেছেন তার হাড়ের ব্যাথা এবং মাংসপেশির ব্যাথায় ভুগেন এবং নারীদের সন্তান প্রসবে জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই ক্ষয়ক্ষতি এই অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ ভাবে বাঁচার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এছাড়া খাদ্য, পানি, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা সহ মানসম্মত জীবনযাপনের অধিকার থেকে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনের নেতীবাচক প্রভাব অধিক হিসাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
এই পরিরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদাপন্নতা অনুধাবন করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি বিবচনায় নিয়ে ডা. ইয়ান ফ্রাই (Dr. Ian Fry) একটি যথাযথ প্রতিবেদন জাতিসংঘে উপস্থাপন করবেন বলে আমরা আশা করি। ডা. ইয়ান ফ্রাই এর এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের প্রান্তিয় জনগোষ্ঠীর দুঃখ লাঘবে কারিগরী এবং আর্থিক সাহায্য প্রাপ্তিতে সহায়তা করবে এবং বিশ্বসম্প্রদায়ে সামনে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয় ক্ষতির বাস্তব চিত্র উন্মোচিত হবে বলে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ প্রত্যাশা করে।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved