
মোঃ নাজমুল ইসলাম মিলন, দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরের সাবেক হুইপ ইকবালুর রহিমের ভাই পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো বীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার আলী শাহ এর বিরুদ্ধে ঘুস, দূনীর্তি, সেচ্ছাচারিতা, বদরাগী, অসদাচরণ ও শিক্ষকদের অবমুল্যায়ন সহ বিভিন্ন অপরাধের চিত্র তুলে ধরে গত ১৬ এপ্রিল উপজেলার ৫৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে প্রদান করেন শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। আবেদনের অনুলিপি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরেও প্রেরণ করা হয়েছে। নিয়োগ বানিজ্যর বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। তার বদলী সহ আইনগত শাস্তি দাবী এবং দুদকের দৃষ্টি আকর্ষন করেন ভুক্তভুগিরা।
অভিযোগ সুত্রে জানাগেছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার আলী শাহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীর এমপিও ভুক্তির জন্য ফাইল প্রেরণ করলে টাকা ছাড়া কোন ফাইল প্রেরণ করেন না। তার চরম দুর্ব্যবহারের কারণে সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ সোহেল আখতার ২০২৪ সালে অফিস থেকে স্বেচ্ছায় বদলী গ্রহণ করে পার্বতীপুর উপজেলায় যোগদান করেন এবং তিনি অপমান সহ্য করতে না পেরে পরবর্তীতে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। কিছুদিন পূর্বে ব্রাহ্মণভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হীরা রায় (নন এমপিও শিক্ষক) কম্পিউটার বিষয়ক ব্যানবেইস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসলে তাঁকে চরম অপমান করে সকলের সম্মুখে ট্রেনিং সেন্টার হতে বের করে দেন। অপমান সহ্য করতে না পেরে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ঘটনাটি উপজেলার সকল শিক্ষক প্রতিবাদ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে মৌখিকভাবে জানানো হলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন মর্মে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ক্ষমা চায়। ২০২২ সালে বীরগঞ্জ উপজেলার ১০ টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় যোগ্যতার ভিত্তিতে এমপিও ভুক্তি লাভ করে। এসকল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিটি এমপিও ফাইল প্রেরণে বারবার মোটা অংকের টাকা আদায় করেন, অন্যথায় ফাইল ফেরত দেন, ছুড়ে ফেলেন। অসদাচরণে শিক্ষা অফিসের স্টাফ, প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, কর্মচারী চরমভাবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। অনতি বিলম্বে উপরোক্ত বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় পরিস্থিতি যে কোন সময় ভয়াবহ পরিস্থিতি ধারণ করতে পারে। বদলী সহ আইনগত শাস্তি দাবী এবং দুদকের দৃষ্টি আকর্ষন করেন ভুক্তভুগিরা।
এ ব্যপারে আত্রাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানায়, দিনাজপুর সদর উপজেলার জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা জুলফিকার আলী শাহ ২০২৩ সালের ২০ মার্চ বীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসাবে যোগদান করেন।
যোগদানের পর হতে তিনি নিজেকে আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক হুইপ ও দিনাজপুর-৩ সদর আসনের এমপি ইকবালুর রহিমের ভাই পরিচয় দিয়ে ( (হুইপ ইকবালুর রহিমের ভাই পরিচয়ে একই এলাকা জালালপুরে বাড়ী ও আত্নীয় হওয়ার সুবাদে) যে কোন অপরাধ পাড় পেয়ে যেতো।
সে সময় শতগ্রাম ইউনিয়নের বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি নিয়োগের অনিয়মের ঘটনায় এলাকাবাসী ঘাড় ধাক্কা দিয়ে লাঞ্চিত করে অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখে।
এমপি ইকবালুর রহিমের সুপারিশে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আওয়ামীলীগের দসর ফজলে এলাহী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেনি সাবেক হুইপ এর কারনে। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পরে তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফজলে এলাহী সহ তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মব তৈরী করে প্রধান শিক্ষকদের সাথে অসদাচরন, লাঞ্চিত করে সাসপেন্ডের হুমকি দিয়ে বিদ্যালয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ মনা ও হিন্দু সনাতন ধর্মীয় প্রধান শিক্ষকদের সাথে। তৎকালীন নির্বাহী অফিসার ফজলে এলাহী ও শিক্ষা অফিসার জোক সাজশে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্রধান শিক্ষকদের সরিয়ে ৩/৪ নং শিক্ষকদের প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার মত ঘোটনাও রয়েছে।
বীরগঞ্জ জনতা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আসমাউল হুসনা অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে এমপিওভূক্ত হওয়া বীরগঞ্জ উপজেলার ১০টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে তার বিদ্যালয়টিও ছিল।
বিদ্যালয়টির আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের কারণে শিক্ষকগণের দুই ধাপে বিল ধরানোর ফাইল পাঠানো হয়। প্রথম ধাপে চার জন শিক্ষকের বিল ধরানো হয়। পরে তার ও একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর বিল ধরানোর ফাইল পাঠানোর জন্য তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার আলী শাহকে দ্ইু লাখ ঘুষ প্রদান করেন। এছাড়াও খরচ হিসেবে আরও কয়েক হাজার টাকা দেন। ২৮-১০-২০২৪ইং তারিখে জুলফিকার আলী শাহ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের সকল কাগজপত্র যাচাই অন্তে সঠিক বলে প্রত্যয়ণপত্র দেন।
কিন্তু পরে নানাবিধ কারণ দেখিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ফাইল ফেরত পাঠান। প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষকদের এমপিওভূক্তির বিল নিয়মিত হলেও অদ্যাবধি আসমাউল হুসনার ফাইল পাঠানোই হয়নি।
উপজেলার ব্রাহ্মণভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ হেলাল উদ্দিন জানান, কিছুদিন পূর্বে তার বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হীরা রায় (নন এমপিও শিক্ষক) কম্পিউটার বিষয়ক ব্যানবেইস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসলে তাকে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় সকলের সম্মুখে অপমান করে ট্রেনিং সেন্টার হতে বের করে দেন। এতে করে তিনি মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে উপজেলার সকল শিক্ষক প্রতিবাদ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে মৌখিকভাবে জানালে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন মর্মে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ঘটনাটির জন্য ক্ষমা চান।
প্রাণনগর আইডিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, উনি (উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার) টাকা ছাড়া কিছু বুঝেন না। সবকিছুতেই তার টাকা চাই। মাস ছয়েক আগে পরিবেশ উন্নয়নের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে গাছ লাগানো বাবদ ৫হাজার টাকা করে সরকারি বরাদ্দ দেয়া হয়। সেটির চেক গ্রহন করতে গেলে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ৬শত টাকা করে নগদে দিয়ে চেক নিতে হয়।
অভিযোগকারী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি বীরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি আহসান হাবীব জানান, তার দূর্নীতি ও অসদাচরণের বিষয়ে সারাদিন বলেও শেষ করা যাবেনা। আমরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানাচ্ছি। অন্যথায় শিক্ষকগণ মাঠে নামতে বাধ্য হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানায়, তিনি যোগদানের পর হতে পাঠদানের অনুমতি বিহিন বিদ্যালয় গুলোতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বই প্রদান করেন। মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলো বই নিতে গেলে তাকে খরচা বাবদ টাকা দিতে হয়।
অপর দিকে শিবরামপুর ইউনিয়নের দেউলী গ্রামের জয়নাল আবেদীনের পুত্র শরীফ আহমেদ জানায়, তৎকালীন নির্বাহী অফিসার ফজলে এলাহী ও শিক্ষা অফিসার জোক সাজশে মুরারিপুর দাখিল মাদ্রাসায় নিয়োগে মোটা অংকের টাকা ঘুস চাওয়া ও অনিয়মের বিরুদ্ধে মাদ্রাসা শিক্ষা বোডের মহাপরিচালক সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরেও প্রতিকার না পেয়ে ২০-০১-২০২৫ তারিখে জেলা দিনাজপুর বীরগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছি, যা এখনো চলমান রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জ ছাড়াও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি বীরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি আহসান হাবীব সহ ৫৪ টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান গন স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগ মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রংপুর অঞ্চলের উপ পরিচালক, দিনাজপুর জেলা প্রশাসক, দিনাজপুর জেলা শিক্ষা অফিসার, বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে দেয় শিক্ষক নেতারা।
এ বিষয়ে বীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার আলী শাহ এর কাছে জানতে চাইলে জানান, তার বিরুদ্ধে আনীত সবকটি অভিযোগ মিথ্যা। যাদের কাজ করে দিতে পারেন নাই তারাই কয়েকজন সংঘবদ্ধ হয়ে অন্যদের জোর জবরদস্তি ও মারধোর করে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করিয়েছে।
বীরগঞ্জ জনতা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আসমাউল হুসনার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সাথে গত এক বছরে আমার দেখা হয়নি। তার ফাইলে সমস্যা আছে।
অভিযোগের বিষয়ে বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমা খাতুনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, এমপি স্যারের কাছে শিক্ষকরা একটা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে শুনেছি। তবে এবিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানিনা। এমপি স্যারও আমাকে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2026 | All Rights Reserved