আজ পবিত্র শবে মেরাজ! চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় আগে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া সেই অলৌকিক মহাযাত্রার স্মৃতিবাহী রজনী। তবে সুফি সাধক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদদের মতে, মেরাজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো ভ্রমণ নয়, বরং এটি মানবাত্মা- পরমাত্মার সাথে মিলনের এক চিরন্তন পথনকশা। সমসাময়িক অস্থির পৃথিবীতে যখন মানুষ কেবল বস্তুগত সুখে নিমজ্জিত, তখন মেরাজের এই ‘রূহানি সফর’ আমাদের শেখায় কীভাবে নশ্বর দেহকে অতিক্রম করে অবিনশ্বর স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা যায়।
** ১. আকল বা যুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ইশকের বিজয়:- সুফি দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘ইশক’ বা প্রেম। মেরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গিয়ে ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ)-এর থেমে যাওয়া এক বিরাট রহস্যের ইঙ্গিত দেয়। কোরআনে এর বর্ণনা এসেছে এভাবে: "তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং তিনি সীমা লঙ্ঘন করেননি।" (সূরা আন-নাজম: ১৭)।
সুফি তাত্ত্বিকদের মতে, জিবরাঈল (আঃ) হলেন ‘আকল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের প্রতীক। জ্ঞান বা যুক্তি স্রষ্টার ঘরের তোরণ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু স্বয়ং স্রষ্টাকে পেতে হলে প্রয়োজন হৃদয়ের প্রেম বা ‘ইশক’। মাওলানা রুমি যেমনটি বলেছেন, "যুক্তি হলো পায়ের জুতো, যা দিয়ে পথ চলা যায়; কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে সেই জুতো খুলে প্রেমের সাগরে ঝাঁপ দিতে হয়।"
** ২. ফানা-ফিল্লাহ ও বাকা-বিল্লাাহ্-র মাধ্যমে আমিত্বের বিসর্জন:- রাসূল (সাঃ) যখন আরশে আজিমে পৌঁছালেন, তখন সেখানে কোনো ব্যবধান ছিল না। সুফি পরিভাষায় একে বলা হয় 'মকামে মাহমুদ'। এখানে পৌঁছে মানুষের সীমাবদ্ধ ‘আমি’ বা নফস বিলীন হয়ে যায় (ফানা), আর অবশিষ্ট থাকে কেবল আল্লাহর নূর (বাকা)।
** হাদিসে কুদসিতে এসেছে:- "বান্দা যখন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার কাছে আসে, আমি তখন তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে..." মেরাজ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, নিজের অহংকার এবং আমিত্বকে বিসর্জন দিলেই কেবল ঐশী নূরের দেখা পাওয়া সম্ভব।
** ৩. ‘আস-সালাতু মিরাজুল মুমিনীন’ হলো আধুনিক ও বাস্তব জীবনে প্রশান্তির চাবিকাঠি:- আজকের যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন মানসিক চাপে পিষ্ট, তখন সুফি মতবাদের ‘সালাত বা নামাজ’ হতে পারে প্রকৃত মেরাজ। রাসূল (সাঃ) মেরাজ থেকে উম্মতের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছেন ৫ (পাঁচ) ওয়াক্ত নামাজ।
** সুফি তত্বে শবে মেরাজের বিশ্লেষণ:- নামাজের প্রতিটি সেজদা হলো আধ্যাত্মিকতার একটি স্তর। সুফিগণ মনে করেন, শরীর জমিনে থাকলেও মুমিনের আত্মা সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর আরশের নিচে পৌঁছে যায়। এটি কেবল কায়িক কসরত নয়, বরং স্রষ্টার সাথে একান্তে কথোপকথন (মুনাজাত)।
** ৪. সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে্ বস্তুবাদের পর্দা উন্মোচন (কাশফ):- বর্তমান পৃথিবীতে আমরা চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য বলে ধরে নিই। কিন্তু শবে মেরাজ আমাদের শেখায় যে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরেও এক বিশাল ‘হাকিকত’ বা পরম সত্যের জগত রয়েছে। নবীজি (সাঃ)-এর জান্নাত ও জাহান্নাম অবলোকন ছিল সেই অদৃশ্যের পর্দা বা ‘কাশফ’ উন্মোচন।
সর্বপরি, আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘মাল্টিভার্স’ বা উচ্চতর মাত্রা (Dimensions) বলা হচ্ছে, সুফিগণ কয়েকশ বছর আগেই তাকে মেরাজের আলোকে ‘নূরের জগত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যখন মানুষের অন্তর পাপাচার ও লোভ থেকে মুক্ত হয়ে আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়, তখনই তার হৃদয়ে সেই ঐশী রহস্যের প্রতিফলন ঘটে।
** ৫. পরিশেষে আত্মার মুক্তি ও মেরাজের শিক্ষা:- শবে মেরাজের নিগূঢ় তত্ত্ব এটাই যে, মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের পুতুল নয়। মানুষের ভেতরে রয়েছে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া রূহ (Spirit)।
* কোরআনের ঘোষণা:- "আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি।" (সূরা বনি ইসরাইল: ৭০)।
এই মর্যাদার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মেরাজে। সুফি মতে, শবে মেরাজ আমাদের সেই সুপ্ত সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়-যদি আমরা আমাদের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে আমাদের আত্মা সাত আসমান ভেদ করে স্রষ্টার নৈকট্য পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।
সারমর্মের সত্য কাহনের উন্মোচনের বাস্তবতায়, আজকের এই পবিত্র রজনী আমাদের কেবল উৎসবের নয়, বরং আত্মসমালোচনার। আমরা কি আমাদের আত্মার সেই ঊর্ধ্বগমনের সিঁড়িতে পা রাখতে পেরেছি? নামাজের মাধ্যমে কি আমরা স্রষ্টার সাথে কথা বলছি? শবে মেরাজ হোক আমাদের ভেতরের অন্ধকারাযুক্ত (অন্ধকারাচ্ছন্ন) সকল কলুষিত পাপাচারের পর্দা সরিয়ে আল্লাহ্-র প্রকৃত জাত সত্তার অস্তিত্বের নূরময় জগৎতের নূরানী নূরের পথে ফেরার এক অনন্য মাধ্যম- আমিন।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved