আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আসন ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দ্বন্দ্বের সুফল যাবে বিএনপির ঘরে। এমনই ধারণা বিভিন্ন আসনের ভোটারদের। নিজেদের এলাকা বরিশালে তিন থেকে চারটি আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। প্রায় সমসংখ্যক আসনে জামায়াতে ইসলামীরও রয়েছে শক্ত অবস্থান। ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর ঐক্যের কারণেই সৃষ্টি হয়েছিল এই পরিস্থিতির। তবে সেই অবস্থান এখন হারাতে বসেছে তারা। ভোট ভাগ হলে দুর্বল হবে তাদের অবস্থান। ফলে জিতে যাবে ধানের শীষ। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে এখানে ২-৩টির বেশি আসন পাবে না জামায়াত ও চরমোনাই। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিলছে এমনই তথ্য।
বরিশালের ২১টি নির্বাচনি এলাকার মধ্যে ২০টিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। জোটকে ছাড়া হয়েছে বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) নির্বাচনি এলাকা। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের জন্য আসনটি ছেড়েছে তারা। ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের আসন বলে পরিচিত বরিশাল-৫ (সদর) আসনেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াজ্জম হোসাইন হেলাল। এদিকে ইসলামী আন্দোলনও একটি আসন রেখে মনোনয়ন দাখিল করেছে ২০টি নির্বাচনি এলাকায়। জামায়াত নেতা মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আসন পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানী)-এ কোনো প্রার্থী দেয়নি তারা। এখানে নির্বাচন করছেন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী। সাঈদীর আরেক ছেলে শামিম সাঈদীর পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনেও মনোনয়ন দাখিল করেছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা। জয়ের সম্ভাবনা থাকা আসনগুলোতে এভাবে পালটাপালটি মনোনয়ন দাখিলের ঘটনাতেই পরিষ্কার হয়ে গেছে জামায়াত আর ইসলামী আন্দোলনের বিরোধ। এ নিয়ে অবশ্য আরও কয়েক দিন আগে থেকেই মিলছিল আভাস। ৮ দলের ঐক্যে এনসিপি-এবি পার্টিসহ আরও তিন দলের যোগদানের দিন যা অনেকটা পরিষ্কার হয়।
মনোনয়ন দাখিলের এই লড়াইয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বরিশাল অঞ্চল। কেননা এখানেই সূতিকাগার চরমোনাই পীর তথা ইসলামী আন্দোলনের। বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নে দরবার শরিফ চরমোনাই পীরের। স্বভাবতই বরিশালে তাদের সাংগঠনিক শক্তি আর জনসমর্থনও বেশি। যদিও এখানকার কোনো আসনেই কখনো জিততে পারেনি ইসলামী আন্দোলনের কোনো প্রার্থী। তবে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকাতেই রয়েছে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক। এই ভোটব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতসহ অন্য ইসলামী দলগুলোর ঐক্য মিলে তাদের জন্য সম্ভাবনা হয়ে ওঠে এখানকার ৩-৪টি আসন। এসব আসন হচ্ছে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া), বরিশাল-৫ (সদর), বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) ও পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী)। একইভাবে জামায়াতও তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দেয় তিনটি আসনে। এগুলো হলো-পিরোজপুর-১, পিরোজপুর-২ ও পটুয়াখালী-২।
এছাড়া বিভাগের অন্য ১৪টি আসনেও তৈরি হয় বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ইসলামী দলগুলোর লড়াইয়ের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দ্বন্দ্বে। ঐক্য না টিকলে বরিশালে একটি আসনও তারা পাবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। যে সংশয় নিশ্চিত করছে এসব আসনে বিএনপি প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা।
বরিশালে এখন পর্যন্ত একটিমাত্র আসনে জয়ের রেকর্ড আছে জামায়াতে ইসলামীর। সেটি মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পিরোজপুর-১। ’৯৬-এর নির্বাচনে ২৮০ ভোটের ব্যবধানে এখানে জেতেন তিনি। সেবার এককভাবে নির্বাচন করেছিল জামায়াত। ২০০১-এ জোটবদ্ধ বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী হয়ে জিতলেও মরহুম সাঈদীর প্রাপ্ত ভোট ছিল পরাজিত প্রার্থীর তুলনায় মাত্র সাত হাজার বেশি। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী যখন বিএনপি-জামায়াত তখন চরমোনাইয়ের ভোটকে ধরা হয়েছিল জয়ের নিয়ামক শক্তি হিসাবে। ঐক্য থেকে চরমোনাই চলে গেলে জয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে জামায়াতের জন্য। একই ঘটনা ঘটতে পারে বরিশাল সদর আসনে। এখানে ২৫ থেকে ৩৩ হাজার ভোট পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের। এর সাথে জামায়াতসহ ঐক্যের অন্য দলগুলোর ভোট যোগ হলে জয় পাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল হাতপাখার। জামায়াত সরে গেলে অসম্ভব হয়ে যাবে সেই সম্ভাবনা। বরিশালের অন্য আসনগুলোতেও ঘটবে একই ঘটনা। ফলে সব আসনেই জয় পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে বিএনপির। বিভিন্ন এলাকার সাধারণ ভোটাররা বলছেন, জামায়াত-চরমোনাইসহ ১১ দলের যে ঐক্য তা ছিল বিএনপির জন্য অশনিসংকেত। শেষ পর্যন্ত এই ঐক্য না থাকলে ধানের শীষের জয় ঠেকানো সম্ভব হবে না কারও পক্ষে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, এটা তো কোনো রাজনৈতিক জোট নয়, এটা হচ্ছে নির্বাচনি ঐক্য। আমরাই প্রথম বলেছি এই ঐক্যের কথা। আমাদের আমির চরমোনাইর পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমই প্রথম বলেছেন যে সব ইসলামী দল মিলে কেন্দ্রে একটি ব্যালট বাক্স পাঠানোর কথা। নির্বাচনি ঐক্যে যেখানে যে দলের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেখানে তারা প্রার্থী দেবে, এটাই তো হওয়ার কথা। সারা দেশের ১৪৩টি আসনে জয়ী হওয়ার মতো অবস্থা আছে আমাদের। অথচ পত্র-পত্রিকায় দেখছি আমাদের নাকি ৩৫টি আসন দেওয়া হচ্ছে। কে নিল এই সিদ্ধান্ত? বরিশাল অঞ্চলেই তো ১৮-১৯টি আসনে জয়ের সক্ষমতা রয়েছে আমাদের। তার পরও আমরা বলছি যে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর নিষ্পত্তি হোক। কিন্তু সেই আলোচনার পরিবেশও পাচ্ছি না। কেউ একজন কিছু একটা চাপিয়ে দিলেই যে মেনে নেব সেটা ভাবা ঠিক নয়। সারা দেশে আমাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। সমঝোতা যদি হয় তো ভালো, নয়তো সব আসনেই নির্বাচন করব।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াজ্জম হোসাইন হেলাল বলেন, এখনই তো সব শেষ হয়ে যায়নি। আমরা আশাবাদী যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved