১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
তেহরান-তেল আবিব-ওয়াশিংটন পরিস্থিতি যেন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে আজকের বিশ্ব। গত রাত থেকে ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক অবস্থানের ওপর যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ 'তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের' দিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমের চোখে যিনি 'স্বৈরাচার', সেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরান এখন বিশ্ব রাজনীতির এমন এক মেরু, যার পতন বা বিজয় মুসলিম বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
** রণক্ষেত্রে ইরান যেন এক অপপ্রতিরোধ্য অক্ষ:- গত রাত থেকে শুরু হওয়া হামলায় ইরান তার ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তির চূড়ান্ত প্রদর্শনী করেছে। বিশেষ করে কাতারে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের সাহসিকতাপূর্ণ হামলা পেন্টাগনকে হতবাক করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার পর ইরানই একমাত্র দেশ যারা সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করার স্পর্ধা দেখালো। এই হামলা প্রমাণ করে যে, 'ডলারের শৃঙ্খল' ভাঙ্গতে চাওয়া এবং ইসরায়েলের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা ইরান পিছু হটতে রাজি নয়।
** পশ্চিমের নীল নকশা ও রেজা পাহলভি ফ্যাক্টর:- পশ্চিমা মদদপুষ্ট সাবেক রাজপুত্র রেজা পাহলভির ফিরে আসার গুঞ্জন ইরানের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, পাহলভির ক্ষমতায় আসা মানেই হবে ইরানের বিশাল তেল ও গ্যাস সম্পদ পশ্চিমাদের হাতে তুলে দেওয়া এবং দেশটিকে একটি 'মার্কিন উপনিবেশে' পরিণত করা। মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন তথা মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর যে শেষ শক্তিটুকু ইরানের রয়েছে, পাহলভি জমানায় তা চিরতরে নিভে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
** বিশ্বশক্তির মেরুকরণে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া:- ইরানের এই লড়াইয়ে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া ও চীন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরীক্ষিত বন্ধু ইরান এখন মস্কোর কাছ থেকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। অন্যদিকে, চীন তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের স্থিতিশীলতা চায়। উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যেকোনো লড়াইয়ে তারা তেহরানের পাশে থাকবে। এই ত্রিভুজ জোট (ইরান-রাশিয়া-চীন) বনাম পশ্চিমা জোট (NATO-ইসরায়েল) বিশ্বকে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
** মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ ও আরব বসন্তের শিক্ষা:- লিবিয়া, সিরিয়া বা ইরাকের 'আরব বসন্ত' পরবর্তী করুণ দশা প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া 'গণতন্ত্র' আসলে সম্পদ লুণ্ঠনের একটি মোড়ক মাত্র। ইরানের পতন হলে সমগ্র মুসলিম জাহানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা ফিলিস্তিনি শহীদদের আত্মত্যাগের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। খামেনিকে যারা 'আল্লাহর সিংহ' হিসেবে দেখেন, তাদের মতে তিনি কেবল শিয়া নেতা নন, বরং শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ ভুলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্ব।
** তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি সন্নিকটে?- ইসরায়েল ও আমেরিকার বর্তমান আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং ইরানের আত্মরক্ষামূলক পাল্টা আঘাতের তীব্রতা দেখে সামরিক বিশেষজ্ঞরা একে 'গ্রেট ওয়ার' বা মহাযুদ্ধের সূচনা বলছেন। যদি ইরান তার পারমাণবিক বা দীর্ঘপাল্লার মিসাইল সক্ষমতা পূর্ণ মাত্রায় ব্যবহার করে, তবে এর প্রভাব আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পৃথিবী এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একপাশে ওয়াশিংটনের অনুমতি নিয়ে শ্বাস নিতে চাওয়া সেক্যুলার পুতুল সরকারগুলো, আর অন্যপাশে মাথা নত না করা এক জেদি প্রতিরোধ। খামেনি বা ইরানের টিকে থাকা এখন আর কেবল একটি দেশের ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক মুসলিম আত্মসম্মান এবং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved