ঢাকা: ০৪ জানুয়ারী ২০২৬, রবিবার :
বিদায়ী ২০২৫ সালে ৬৭২৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১১ জন নিহত, ১৪৮১২ জন আহত হয়েছে। রেলপথে ৫১৩ টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত, ১৪৫ জন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ১২৭ টি দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত, ১৩৯ জন আহত এবং ৩৮ জন নিখোঁজ রয়েছে। এবছর ২৪৯৩ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৯৮৩ জন নিহত ও ২২১৯ জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ ও আহতের ১৪.৯৮ শতাংশ। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সর্বমোট ৭৩৬৯ টি দুর্ঘটনায় ৯৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫০৯৬ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে প্রতিবছরের ন্যায় এই প্রতিবেদন তৈরি করে।
আজ ০৪ জানুয়ারী রবিবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এহেন ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা ও উন্নত গণপরিবহনের অঙ্গীকার দাবী করেছেন সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদায়ী ২০২৫ সালে ৬৭২৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১১ জন নিহত, ১৪৮১২ জন আহত হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ৬.৯৪ শতাংশ, নিহত ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহত ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ১৯০ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৬৯১ জন চালক, ১২১৬ জন পথচারী, ৫৫১ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৩২ জন শিক্ষার্থী, ১২৯ জন শিক্ষক, ১০৫৬ জন নারী, ৬২২ জন শিশু, ৬৯ জন সাংবাদিক, ১৫ জন চিকিৎসক, ১১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ০৫ জন আইনজীবী ও ০৯ জন প্রকৌশলী এবং ১৪১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।
এর মধ্যে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য, ২০ জন সেনা সদস্য, ০১ জন নৌবাহিনী সদস্য, ০৩ জন আনসার সদস্য, ০২ র্যাব সদস্য, ০২ জন ফায়ারসার্ভিস সদস্য, ০৩ জন বিজিবি সদস্য, ১০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৪ জন সাংবাদিক, ৪১৫ জন নারী, ৫৪৬ জন শিশু, ৬৩৩ জন শিক্ষার্থী, ১২২ জন শিক্ষক, ১৫৫৭ জন চালক, ২১৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ০৯ জন প্রকৌশলী, ০৫ জন আইনজীবী, ১০৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৪ জন চিকিৎসক ও ১১৪৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে।
এ সময়ে সংগঠিত দুর্ঘটনায় সর্বমোট ১০২৮৮ টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে, যার ১৪.৪৯ শতাংশ বাস, ২২.৬০ শতাংশ ট্রাক-পিকাপ-কাভার্ডভ্যান ও লরি, ৫.৮৫ শতাংশ কার-জীপ-মাইক্রোবাস, ৬.৬৩ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ২৮.৪৮ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৩.৫৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক, ৮.৩৮ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্
দুর্ঘটনায় সংগঠিত যানবাহনের ১.০৪ শতাংশ বাস, ০.৯৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১.০৬ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ১.০১ শতাংশ নসিমন-মাহিন্দ্রা-লেগুনা সড়কে দুর্ঘটনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ০.৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-লরি, ৩.০২ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা-ভ্যান-ইজিবাইক, ০.৩৬ শতাংশ কার-জীপ-মাইক্রোবাস সড়কে দুর্ঘটনা বিগত বছরের চেয়ে কমেছে।
সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪৮.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা, ২৬.০০ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৬৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৫.৩৭ শতাংশ বিবিধ কারনে, ০.৪৪ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁছিয়ে এবং ০.৬৮ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে মোট সংগঠিত দুর্ঘটনার ৩৮.২২ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.১৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮.৮৩ শতাংশ ফিডার রোডে সংগঠিত হয়েছে। এছাড়াও দেশে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪.২২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, ০.৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
বিদায়ী বছরে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও এসব যানবাহন অবাধে চলাচলের কারনে জাতীয় মহাসড়কে ২.৫৫ শতাংশ, আঞ্চলিক মহাসড়কে ৫.৪৭ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এবার ফিডার রোডে ৬.৯৮ শতাংশ, ঢাকা মহানগরীতে ০.৭১ শতাংশ, ০.৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, রেলক্রসিং-এ ০.০৫ শতাংশ দুর্ঘটনা কমেছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ :
১। বেপরোয়া গতি। ২। বিপদজনক অভারটেকিং। ৩। সড়কের নির্মাণ ত্রুটি। ৪। ফিটনেসবিহীন যানবাহন। ৫। চালক, যাত্রী, পথচারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসতর্কতা। ৬। চালকের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সংক্রান্ত অজ্ঞতা। ৭। পরিবহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব। ৮। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার। ৯। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। ১০। অরক্ষিত রেলক্রসিং। ১১। রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা। ১২। ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্নীতি। ১৩। ট্রাফিক আইন অমান্য করা। ১৪। রোড সাইন ও রোড মার্কিং না থাকা। ১৫। সড়কে চাঁদাবাজি। ১৬। রাস্তার উপর হাট-বাজার। ১৭। মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা। ১৮। চালকের নিয়োগ ও কর্মঘন্টা সুনির্দিষ্ট না থাকা। ১৯। সড়কে আলোকসজ্জা না থাকা। ২০। রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উচু না থাকা। ২১। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দ্বায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকা। ২২। দেশব্যাপী নিরাপদ, আধুনিক ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক-ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার কারনে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ভয়াবহভাবে বাড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশমালা :
১. প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবহনখাত সংস্কার সড়ক নিরাপত্তা, উন্নত গণপরিবহন ও যাত্রী অধিকারের বিষয়টি অর্šÍভুক্ত করা।
২. নির্বাচনী এলাকার অধিবাসীদের সড়ক নিরাপত্তা, যাতায়াতের ভোগান্তি লাঘবের বিষয়ে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্ন্তভুক্ত করা।
৩. সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্ধ বাড়ানো, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক নিরাপত্তা উইং চালু করা।
৪. সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি নাগরিককে সরকারের ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে সহজে ও দ্রুততম সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলে সরকার ঘোষিত ৬০ঘন্টার ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা।
৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্টা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাঁবাজি বন্ধ করা।
৭. গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস প্রদান ও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে উন্নত বিশ্বের কারিকুলাম চালু করা।
৮. ভয়াবহ ধুলা দুষণে লক্ষলক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে ঢাকনা বিহীন রিকশা, ব্যাটারীচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশার পরিবর্তে দেশের সকল নগরীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ইলেকট্রিক এসি বাসের শক্তিশালী নেটওর্য়াক গড়ে তোলা।
৯. ট্রাফিক পুলিশের গতানুগতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১০. সড়কে বৈধ যানবাহন ও অবৈধ যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা লেইন প্রবর্তন করা।
১১. প্রতিটি জাতীয় মহাসড়কে ছোট ছোট যানবাহনের জন্য আলাদা সার্ভিস লেইন তৈরি করা।
১২. গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ তহবিলসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পক্ষে যাত্রী সাধারনের প্রতিনিধি অর্ন্তভুক্ত করা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও সড়কের নীতি পরিবর্তন না হওয়ায় সড়কে দুর্ঘটনা ও মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। যানজট ও চাঁদাবাজির বৃদ্ধির কারণে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ভাড়া আরেক দফা বেড়েছে। অন্তবর্তী সরকার সড়ক পরিবহনখাত সংস্কার না করায় দেশের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি, সড়কের নিরাপত্তা ও ভাড়া নৈরাজ্য পরিবহন মালিকদের ইচ্ছের বন্দি দশা থেকে মুক্তি মেলেনি ।
সম্পাদক: মোঃ শাহাব উদ্দিন, প্রকাশক: মোঃ শাহজাদা হোসাইন, নির্বাহী সম্পাদক : এম শহিদুল ইসলাম নয়ন
অফিস: ১৪/১৬ কাজলারপাড়, ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬
@ Economicnews24 2025 | All Rights Reserved